মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে ভিআইপি ও জরুরি সেবার জন্য সড়কে পৃথক লেন করার সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাইয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে রাজধানীর সড়কগুলোতে এমন পৃথক লেন চালু হলে তা বিদ্যমান সড়ক ব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের আশঙ্কা, এই পৃথক লেনে যানজট মারাত্মক আকার ধারণ করবে, সড়কে দেখা দেবে বিশৃঙ্খলা। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সেই যানজট থেকে নিজেরা রেহাই পেতেই মন্ত্রিপরিষদের এমন প্রস্তাবনা— এমন অভিযোগও করছেন তারা। জনবান্ধব সরকারের এমন অ-জনবান্ধব সিদ্ধান্ত সরকারের জনপ্রিয়তার জন্য হুমকি হিসেব কাজ করবে বলেও মনে করছেন তারা।
ভিআইপি ও অ্যাম্বুলেন্সসহ পুলিশের জরুরি সেবা দিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থার গাড়ি চলাচলে রাজধানীর রাস্তায় আলাদা লেন করার সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কাছে এই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে সোমবার (৫ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকের শেষে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।
এসময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘বিশেষ করে ইমার্জেন্সি সার্ভিসের জন্য আলাদা লেন দরকার। ভিআইপিরা অত বেশি ইম্পর্ট্যান্ট না। অ্যাম্বুলেন্সে যে লোকটা মারা যাচ্ছে, তার জন্য ইমার্জেন্সি দরকার। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের অনেক সময় ইমার্জেন্সি সার্ভিস দরকার হয়।’
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে ভিআইপিদের জন্য আলাদা একটা লেন করার জন্য কোনও নির্দেশনা মন্ত্রিসভা দিয়েছে কিনা, জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘‘মন্ত্রিসভা এটা বলেনি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটা ‘নরমাল’ অনুরোধ করা হয়েছে, এটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য।’’ তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেন আছে। আমাদের দেশেও সেটা করা যায় কিনা, সেটা পরীক্ষা করে দেখার অনুরোধ করা হয়েছে মাত্র। ভিআইপিরা প্রায় সময় ডান দিক দিয়ে যান, উল্টো দিক দিয়ে যান। এতে নানা ধরনের অসুবিধা হয়। ভিআইপিদের অনেক সময় (উল্টো পথে) যাওয়ার প্রয়োজন হয়।’
মন্ত্রিপরিষদের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঢাকায় এমন ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। সম্প্রতি রিভাইজ এসটিপি হয়েই গেছে। সুতরাং এটা কীভাবে সম্ভব? এটা জনবন্ধব কোনও সিদ্ধান্ত নয়।’ এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে সড়কে যানবাহনের গতি শূন্যের কোটায় এসে দাঁড়াবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘রাস্তায় ধারণক্ষমতা নেই। এরপরও বিভিন্ন ধরনের গণপরিহনের অহরহ অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। চাইলে ব্যক্তিগত বা ছোট গাড়ির অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এটাও একটা দেউলিয়াপনা। সেখান থেকে যদি আবার সড়কের একটি অংশ ভিআইপি বা ইমার্জেন্সির নামে কেটে নেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে পড়বে। এই ভিআইপি কালচারটাও কিন্তু অসুস্থ চিন্তা।’
সরকার এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে আম জনতার জন্য গৃহীত প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে বলে মনে করেন ড. শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘যদি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতেই হয়, তাহলে পুরো রিভাইজ এসটিপি আবার মূল্যায়ন করতে হবে। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত মানুষকে আহত করবে।’
ড. শামসুল হক আরও বলেন, ‘আমরা খুশি হতাম যদি সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা খরচের পরও যানজট থেকে মুক্তি না পাওয়ার কারণ খুঁজতে চাইত। সরকারের উচিত হবে যানজট বাড়ার কারণ বের করে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু সরকার যানজটের দায় না নিয়ে বরং এর কষ্ট থেকে নিজেরা মুক্তি পাওয়ার ব্যবস্থা করতে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সরকারের লোকেরা যানজট থেকে মুক্তি পাবে, আর জনগণ সেই যানজটে ভুগবে— এটা সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না।’ ভিআইপি’র নামে একটি শ্রেণিকে সাধারণ জনগণের তুলনায় বাড়তি সুবিধা দেওয়া ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভিআইপিদের জন্য পৃথক লেনের সিদ্ধান্তকে দুর্ভিক্ষের সময় সাধারণ মানুষের খাবার কেড়ে নিয়ে ধনীদের খেতে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ মোবাশ্বের হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফ্লাইওভার বানিয়ে যেমন সড়কের নিচের ৮০ শতাংশ রাস্তা কমিয়ে ফেলা হয়েছে, তেমনি এই সিদ্ধান্তেরও সঠিকতা নেই। রাস্তার ধারণক্ষমতা না বাড়িয়ে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত সড়ক ব্যবস্থাপনায় আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।’
এই নগর পরিকল্পনাদিব ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘ভিআইপি কারা? ভিআইপিদের সংজ্ঞা কী? সরকারের যদি ভিআইপিদের জন্য এমনই মায়া হয়, তাহলে হেলিকপ্টার সার্ভিস চালু করুক। সেটাতে তো আর কোনও যানজট নেই।’
রাজধানীর সড়কগুলোর বাস্তবতা তুলে ধরে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, ‘ঢাকার সড়কগুলোতে ছয়টি লেনের বেশি নেই। কোথাও কোথাও এক বা দুই লেনও রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিটের (এমআরটি) জন্য একটি ও বাস র্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) জন্য একটি— মোট দু’টি লেন চলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যদি ভিআইপি বা জরুরি সেবার নামে আরও একটি লেন চলে যায়, তাহলে তো আর সড়কই থাকছে না।’ এ ক্ষেত্রে সড়ক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একটি গণতান্ত্রিক জনবান্ধব হিসেবে পরিচিত সরকার এমন অ-জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ।








