ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহকারী শাহাবুদ্দিন মাতুব্বরের বিরুদ্ধে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সংস্থার মালামাল কেনা ও সরবরাহে কমিশন আদায়, ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করে নিম্নমানের মালামাল সংগ্রহ, অফিসের গোপন তথ্য আগেই ঠিকাদারকে জানিয়ে দেওয়া, বিনা টেন্ডারে মালামাল কেনার অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন সময় একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেয়রসহ সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এসব অভিযোগ লিখিতভাবে জানালেও তার বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে শাহাবুদ্দিন মাতুব্বরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা সাখাওয়াৎ হোসেন। এদিকে এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটির সচিব শাহাবুদ্দিন খান বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জানা গেছে, প্রতিবছর ডিএসসিসির ২১টি বিভাগের জন্য তিন শতাধিক রকম মালামাল সংগ্রহ করতে হয়। ডিএসসিসির প্রয়োজনীয় মালামাল কেনা, মজুদ ও সময়মতো চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করার দায়িত্ব পালন করেন ভাণ্ডার বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ জন্য ডিএসসিসির বাজেটে প্রতি অর্থবছরের জন্য এ খাতে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে—এসব পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে কমিশন নেন শাহাবুদ্দিন মাতুব্বর। সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি জানলেও তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেন না বলেও একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ রয়েছে।
২০১৭ সালের ২৩ জুলাই শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের তথ্য-উপাত্ত দিয়ে মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে লিখিতভাবে জানায় চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ফোর পি লজিস্টিকস, মেসার্স সম্রাট কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, মেসার্স মালিহা এন্টারপ্রাইজ ও মুক্তা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঠিকাদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিটি কাজেই শাহাবুদ্দিনকে ঘুষ দিতে হয়। অনেক সময় তিনি অফিসের গোপন তথ্য অন্যান্য ঠিকাদারকে সরবরাহ করেন। তিনি ডিএসসিসিতে নিজের রাজত্ব কায়েম করেছেন।’
এ বিষয়ে ডিএসসিসির সচিব শাহাবুদ্দিন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি। কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হবে। দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ডিএসসিসির প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তার পদটি প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের। এ পদে স্থায়ী কোনও কর্মকর্তা নেই। ফলে দুই-এক বছর দায়িত্ব পালন করার পর আবার তারা বদলি হয়ে চলে যান। কিন্তু প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহকারীর পদটি স্থায়ী। মূলত এ দফতরের সব কাজ তার হাত দিয়েই হয়। ১০ বছর ধরে এই পদে কর্মরত আছেন শাহাবুদ্দিন মাতুব্বর।
ডিএসসিসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শাহাবুদ্দিন মাতুব্বর যোগ দেওয়ার পর থেকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ঘুষ ছাড়া তিনি কোনও কাজে হাত দেন না। নিয়ম অনুযায়ী বিভাগের ভাণ্ডার রক্ষকদের কেনাকাটার বিষয়টি দেখার কথা। অন্য ভাণ্ডার রক্ষকদের অভিযোগ, ডিএসসিসিতে তিনজন ভাণ্ডার রক্ষক থাকার পরও তাদের কোনও কাজ দেওয়া হয় না। সব কেনাকাটা তিনি নিজেই করেন। এক্ষেত্রে কোনও নিয়ম অনুসরণ করেন না। এখন একজন ভাণ্ডার রক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এর আগে একই পণ্য দুবার কেনা দেখিয়ে বিল নিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, প্রতিমাসে জরুরি ভিত্তিতে কেনাকাটার জন্য ‘ইমপ্রেসড মানি’ বাবদ এক লাখ টাকা করে প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তার নামে বরাদ্দ থাকে। কিন্তু প্রতিবারই ভুয়া ভাউচার তৈরি করে পুরো টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগে বলা হয়েছে, ডিএসসিসির ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট বই ছাপানোর কাজেও ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। ১০০ জিএসএম আর্ট পেপার ও ৩০০ জিএসএম আর্ট কার্ডের কভারের বাজেট বই ছাপাতে সর্বোচ্চ প্রতিটি ৬০ টাকা খরচ হওয়ার কথা। অথচ এ বই ছাপানো হয়েছে প্রতিটি ২৮৫ টাকা দরে। এতে প্রতিটি বই থেকে ২১৫ টাকা হিসাবে এক হাজার বই ছাপিয়ে দুই লাখ ১৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
মশার ওষুধ কেনাকাটায়ও অনিয়ম হয়েছে। প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তার এই ব্যক্তিগত সহকারী কোনও উন্মুক্ত টেন্ডার বা ই-টেন্ডার ছাড়াই নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডকে কার্যাদেশ দিয়েছেন। এ কোম্পানির মাধ্যমে ডিএসসিসি এ পর্যন্ত মোট ৩২ কোটি টাকার ওষুধ কিনেছে। এ জন্য ডকইয়ার্ডের মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে দুই শতাংশ হারে ৬৪ লাখ টাকা কমিশন নেওয়া হয়েছে।
সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, মশার ওষুধ কেনার টাকা থেকে রীতি অনুযায়ী কমিশনের দুই শতাংশ থেকে পাওয়া টাকার মধ্যে প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তা পেয়ে থাকেন ২৫ শতাংশ, তার পিএ পান ১৩ শতাংশ, দুজন ভাণ্ডর ও ক্রয় কর্মকর্তা পান ১৩ শতাংশ করে, আর বাকিটা ওই বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
২০১৭ সালের ২৩ জুলাই ঠিকাদারদের আনা অভিযোগে বলা হয়েছে, বছরের পর বছর অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে শাহাবুদ্দিন মাতুব্বর বেশ কয়েকটি বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছেন। মিরপুরের বড়বাগ বসতি হাউজিংয়ের ১নং রোডের তিন নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় সি-২ ফ্লাটটি তিনি কিনেছেন। তিনি চিড়িয়াখানা রোড সংলগ্ন বেড়িবাঁধ এলাকায় আট কাঠা জমি কিনেছেন। এছাড়া তিনি একটি সাদা রঙের নোয়া গাড়ির (ঢাকা মেট্রো-চ-১৫-৪৫৬৮) মালিক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির ক্রয় বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, ‘প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন মাতুব্বরের নানা হয়রানির শিকার ওই বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তার মিথ্যা অভিযোগে চাকরি হারিয়ে ভাণ্ডার রক্ষক (মুদ্রণ ও মনোহরী) নজরুল ইসলাম ভুইয়া স্ট্রোক করে মারা গেছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহাবুদ্দিন মাতুব্বর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাকে হেয় করার জন্য এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। আমি এসবের সঙ্গে জড়িত নই। আমি কেনাকাটা করি না। যা কিছু করতে হয়, কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব প্রতিষ্ঠান অভিযোগ দিয়েছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানই বলেছে অভিযোগগুলো সত্য নয়। মুক্তা কনস্ট্রাকশনকে ২০১৭ সালের ২৬ অক্টোবর স্মারক নম্বরসহ চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, আমার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ সত্য কিনা। এসব অভিযোগ সত্য নয় বলে তারা লিখিতভাবে আমাকে জানিয়েছে।’








