সাহসী সেনানী, সম্মুখ সমরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছেন অস্ত্র হাতে। দেশকে স্বাধীন করার সেই যুদ্ধে জয়ী হলেও জীবনযুদ্ধে পরাজিত হতে বসেছিলেন বীরপ্রতীক হামিদুল হক। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীরটা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হলেও অর্থাভাবে চিকিৎসাও করাতে পারেননি। এ খবর একটি পত্রিকায় প্রকাশ হলে হামিদুল হকের চিকিৎসায় এগিয়ে এসেছে ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল। সেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উপযুক্ত সম্মান পেয়ে অভিভূত তিনি।
বীরপ্রতীক হামিদুল হকের অবহেলায় পড়ে থাকার সংবাদ চোখে পড়ে ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজের। তারই উদ্যোগে মঙ্গলবার (২৭ মার্চ) বীরপ্রতীক হামিদুল হককে ভর্তি করা হয় ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে।
মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে হামিদুল হকের ছেলে ওবাইদুল হক তাকে নিয়ে আসেন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. তাসাদ্দুক আহমেদ প্রাথমিকভাবে হামিদুল হকের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। পরে তিনি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাবরীনা ইয়াসমীনের অধীনে ভর্তির সুপারিশ করেন। সেই অনুযায়ী তাকে ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানান হাসপাতালের তথ্য কর্মকর্তা সুব্রত মণ্ডল।
হাসপাতালের ভর্তির পরপরই ডা. সাবরীনা ইয়াসমীনের তত্ত্বাবধানে জুনিয়র চিকিৎসকরা সবকিছু পরীক্ষা করে দেখেন হামিদুল হকের। এমন সময় অঝোরে কেঁদে ওঠেন জাতির এই সূর্য সন্তান। তিনি বলেন, ‘এত ভালোবাসা আমি কোথায় রাখব?’ এ সময় চিকিৎসকরাও আবেগ্লাপুত হয়ে পড়েন।
হামিদুল হকের চিকিৎসা প্রসঙ্গে হাসপাতালের ডা. এম এ আজিজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তাকে মেডিসিন বিভাগের অধীনে ভর্তি করেছি। তার শারীরিক অবস্থার খুঁটিনাটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার চিকিৎসার সার্বিক সহযোগিতা করবে।’
বীরপ্রতীক হামিদুল হকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭১ সালে স্থানীয় কচুয়া পাবলিক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনতে ৫ মার্চ ভোরে ঢাকার পথে রওনা দেন তিনি। বাল্যবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুস সামাদের হলে গিয়ে ওঠেন তিনি। ৭ মার্চ ভোরে চলে যান রেসকোর্স ময়দানে (এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। ঐতিহাসিক সেই ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। যোগ দেন টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীতে। কালিহাতীসহ বেশকিছু স্থানে যুদ্ধ করেন। পাশাপাশি কাদেরিয়া বাহিনীর বেসামরিক বিভাগেরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু দায়িত্ব পালন করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য হামিদুল হককে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তার বীরত্বভূষণ নম্বর ৪২২। তিনি ১৯৭২ ও ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার একাধিকবার দেখাও করেছেন।
১৯৯০ সালে সখীপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন হামিদুল হক। বর্তমানে সখীপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের একটি ভাড়া বাসায় সপরিবারে বসবাস করছেন তিনি। স্ত্রী রোমেচা বেগম এবং চার ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে দিন কাটছে হামিদুল হকের।
আরও পড়ুন-
‘এ দেশ জঙ্গিদের হবে না, স্বাধীনতাবিরোধীদের হবে না; এ দেশ হবে মুক্তিযোদ্ধাদের’








