বাংলাদেশে ১০ জেলায় গণকবর, বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্রের নতুন হিসাব প্রকাশ করেছে গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র। স্বাধীনতার পর এই প্রথম এ ধরনের কোনও জরিপ চালানো হয়েছে। এই জরিপের প্রাথমিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে জেলা ১০টিতে দুই হাজার ১০৭টি গণকবর, বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্র পাওয়া গেছে। এই ১০টি জেলা হলো নীলফামারী (প্রাপ্ত গণকবর, বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্রের সংখ্যা ৮৫), বগুড়া (১৩৯), নাটোর (১২৬), কুড়িগ্রাম (৮৪), পাবনা (১২৬), রাজশাহী (২২৬), সাতক্ষীরা (৪১), নারায়ণগঞ্জ (২৮৮), ভোলা (৭৪) ও খুলনা (১২২৭)।
আজ শুক্রবার (৩০ মার্চ) বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে ‘গণহত্যা বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ’ শীর্ষক দিনব্যাপী সেমিনারে এ হিসাব প্রকাশ করা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তিনি বলেন, ‘গণহত্যা-গণকবর নিয়ে কাজ করাটা কতটা প্রয়োজনীয়, তা বলে বোঝানো যাবে না। এই কাজ দেশের প্রতিটি স্থানে ছড়িয়ে দিতে হবে। এখানে থামলে আমাদের চলবে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বাদ দিয়ে আমাদের আমাদের সংস্কৃতির চর্চা হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধকে সঙ্গে নিয়েই সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে।’
সংস্কৃতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত অনেক হত্যাকাণ্ডের কথা আমাদের অজানা রয়ে গেছে। এই ইতিহাস তরুণ প্রজন্মকে জানাতে হবে, সারাবিশ্বকে জানাতে হবে। আজকে মিয়ানমারের গণহত্যাকে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতি দিলেও বাংলাদেশের গণহত্যার কোনও স্বীকৃতি নেই। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা ছিল আরও ভয়াবহ। কোন রাজনীতির কারণে এই গণহত্যার স্বীকৃতি মিলছে না— তা আমার জানা নেই।’
এর আগে অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন অধ্যাপক মুনতাসির মামুন। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এই প্রথম গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর নিয়ে জরিপ শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলায় এই জরিপ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে দেশের প্রতিটি জেলায় এই জরিপ চালানো হবে। গণহত্যার ওপর দুই থেকে তিনশ বই বের করতে পারলে আমার মনে হয় গণহত্যা নিয়ে কোনও প্রশ্ন থাকবে না।’
দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি থাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা সহজে গণহত্যা চালানোর সুযোগ পায় উল্লেখ করে মুনতাসির মামুন বলেন, ‘এখানে ধীরে ধীরে দীর্ঘদিন ধরে গণহত্যা চালানো হয়নি, খুব দ্রুত এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি থাকায় অল্প সময়ে অনেক বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। যেমন— চুকনগরে কয়েক ঘণ্টায় প্রায় ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এত কম সময়ে এত বেশি মানুষকে আর কোথাও হত্যা করা হয়নি।’
মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে প্রাণ হারানোদের সংখ্যার বিষয়ে অধ্যাপক মুনতাসির মামুন বলেন, ‘সার্বজনীন মানবাধিকার জরিপের ভিত্তিতে জাতিসংঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ১৯৮২ সালে। তাতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছিল। জাতিসংঘের অনুমিত সর্বোচ্চ গড় হিসাবে নিলে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখ পেরিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা ৩০ লাখ বলে যে হিসাব সরকার দিয়েছিল, সেটাও সারাবিশ্ব মেনে নিয়েছে।’
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এ ধরনের গবেষণার ফল বই আকারে বের করে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি উদ্যোগে পৌঁছাতে হবে। তাহলেই এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণ প্রজন্ম গড়ে উঠবে।’
শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘এই গণহত্যার প্রচুর প্রমাণ পাকিস্তানে রয়েছে। সেগুলো সংগ্রহের উদ্যোগও আমাদের নিতে হবে। আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, যারা এ দেশে গণহত্যা নিয়ে কটূক্তি করে, যারা ইতিহাস বিকৃত করে, তাদের জন্য শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করা হোক।’
আরও পড়ুন-
যে কারণে স্বর্ণের নিলাম বন্ধ
ব্যাংক খাতে সুদের হার নিয়ন্ত্রণে আনতে অর্থমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক








