দুই দফায় দীর্ঘ বৈঠক করেও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ এ সংশোধনী প্রস্তাবের খসড়া চূড়ান্ত করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত না করে আবারও তা পর্যালোচনার জন্য আইন সংস্কার কমিটিতে ফেরত পাঠিয়েছে ইসি। বৃহস্পতিবার কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত সোমবার (৯ এপ্রিল) আরপিও-তে প্রস্তাবিত ৩৫টি সংশোধনী চূড়ান্ত করতে দিনভর বৈঠক করেছিল নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবারও এটি নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করে। কিন্তু দুই দফা বৈঠক করেও আরপিও সংশোধনের সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি ইসি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনি প্রস্তুতিতে এমনিতেই রোডম্যাপ থেকে পিছিয়ে রয়েছে কমিশন। অন্যদিকে আরপিও সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং ও সংসদে উত্থাপনসহ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ ও তা পাস করা সময় সাপেক্ষ বিষয়। এমন পরিস্থিতিতে আবারও আরপিও সংশোধনী পর্যালোচনা ইসির আইন সংস্কার কমিটির কাছে পাঠানো হলো। ফলে আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে আরপিও সংশোধন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ এপ্রিল) কমিশন সভার বিষয়ে ইসির সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আইন সংস্কার সংক্রান্ত কমিটি আরপিও-তে ৩৫টি সংশোধনী প্রস্তাব করেছে।এগুলো নির্বাচন কমিশনাররা পর্যালোচনা করেছেন। কমিশন মনে করে এগুলো আরও পর্যালোচনা করা দরকার। কোনটা বাস্তবতার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য,কোনটা গ্রহণযোগ্য নয়, তা নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বাধীন উপকমিটি আবারও পর্যালোচন করে প্রস্তাব করবে। প্রস্তাব পাওয়ার পর কমিশন ফের তা নিয়ে আলোচনা করবে।’
দশম সংসদে এই সংশোধনী পাস করানো যাবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘উপকমিটির রিভিউ প্রস্তাব পাওয়ার পর বোঝা যাবে আরপিও’র সংশোধনী এই সংসদে পাস করে কার্যকর করা যাবে কিনা। যখন সংশোনী খসড়া চূড়ান্ত হবে, তখন বোঝা যাবে, যদি সংসদের পরবর্তী অধিবেশন ধরা যায়।’
জানা গেছে, ইসির ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী গত বছরের ডিসেম্বরে আইন সংস্কারের প্রাসঙ্গিক খসড়া প্রস্তুত এবং এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইন প্রণয়নের কথা ছিল। কিন্তু ঘোষিত রোডম্যাপ থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে ইসি। এমন অবস্থায় আরপিও-তে সংশোধনীর প্রস্তাব করে আইন সংস্কারকমিটি।
ইসির সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিল, নির্বাচন কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষমতা ইসির হাতে রাখা, স্বচ্ছতার জন্য নির্বাচন কর্মকর্তাদের নামের তালিকা ভোটের তিন দিন আগে প্রকাশ, স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে এক হাজার ভোটারের স্বাক্ষর রাখা, ইভিএমে ভোট গ্রহণ, সমভোটের ক্ষেত্রে লটারির বিধান বাতিল করা, নির্বাচনে অবৈধ টাকার প্রভাব ও অতিরিক্ত ব্যয় বন্ধে মনিটরিং কমিটিসহ ৩৫টি সংশোধনী প্রস্তাব করে কমিটি।
গত ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম দফার বৈঠকে নির্বাচনে দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষমতা ইসির হাতে রাখা এবং ইসির আদেশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বদলি করা না হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এ নিয়ে কমিশনারদের মধ্যেই দ্বিধাবিভক্তি দেখা দেয়। পরে বৈঠক মুলতবি করা হয়। বৃহস্পতিবার মুলতবি বৈঠকে ওই বিষয়টি অপেক্ষমান রেখে অন্যান্য সংশোধনীর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু বাকি অনেকগুলো ধারা-উপধারার সংশোধনীর বিষয়ে কমিশন একমত হতে না পারায় এটি আবারো আইন ও সংস্কার কমিটিতে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
এ বিষয়ে বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসির সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আইন সংস্কার সংক্রান্ত কমিটিকে কোনও সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি। যত দ্রুত সম্ভব তাদের পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।’
যত শিগগির সম্ভব প্রস্তাব পাওয়ার পর সংসদে পাসের জন্য পাঠানো হবে বলে তিনি জানান।
রোডম্যাপ অনুযায়ী আইন সংস্কার করতে না পারার বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘আরপিও সংস্কার নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। যেহেতু রোডম্যাপ দেওয়া হয়েছে, অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে ‘
তিনি বলেন, ‘আইনের সংশোধন চলমান প্রক্রিয়া। প্রত্যেক কমিশন আরপিওতে কিছু না কিছু সংশোধন আনে। সে হিসেবে যুগোপযোগী করার জন্য সংশোধন আনার চেষ্টা করছে এই কমিশন।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘যেগুলো সমসমায়িক উপযোগী এবং পাস করতে সহজ হয়, সেভাবে সংশোধনী আনার জন্য কমিটিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, আরপিও বাংলায় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য একজন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হবে।’
সচিব বলেন, ‘নির্বাচনের আচরণ বিধি পরির্তনের বিষয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। পরবর্তীতে হয়তো হতে পারে।’
একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে গত বছরের জুলাইয়ে সাতটি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল ইসি। এর একটি আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার। সেখানে আরপিও সংশোধনের কথাও বলা হয়। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী সুশীল সমাজ, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে এসংক্রান্ত পরামর্শও নেয় ইসি। প্রায় সব কটি দল আরপিও’র কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংশোধন আনার প্রস্তাব করে। যদিও প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মৌলিক তেমন কোনও পরিবর্তনের প্রস্তাব করেনি ইসির আইন সংস্কার কমিটি।








