ধর্ষণের শিকার নারীর ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ধর্ষণের ক্ষেত্রে ‘পিভি টেস্ট’ নামে পরিচিত আঙুলের সাহায্যে বায়ো ম্যানুয়াল টেস্ট করাও নিষিদ্ধ করেছেন আদালত।
পাশাপাশি এখন থেকে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশু ভিকটিমের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে ২০১৭ সালে সরকার ঘোষিত গাইডলাইন (প্রটোকল ফর হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার) কঠোরভাবে অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বৃহস্পতিবার (১২ এপ্রিল) এ সংক্রান্ত রুল নিষ্পত্তি করে বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি একেএম সাহিদুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব নির্দেশনাসহ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও শারমিন আক্তার। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এএসএম নাজমুল হক।
রায়ে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়ে আদালত বলেছেন, ‘ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর পরীক্ষা একজন নারী চিকিৎসক বা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দিয়ে করাতে হবে। এ সময় একজন নারী গাইনোকোলজিস্ট, একজন নারী ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ভিকটিমের একজন নারী আত্মীয়, একজন নারী পুলিশ সদস্য ও নারী সেবিকা রাখতে হবে।’
‘ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ যে সনদ দেবেন তাতে অভ্যাসগত যৌনতা বলে কোনও মন্তব্য করা যাবে না। পরীক্ষার পর ধর্ষিণের শিকার নারীর যাবতীয় গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। এছাড়া, বিচারাধীন মামলায় নিম্ন আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণকালে নারীকে অমর্যাদাকর কোনও প্রশ্ন করা যাবে না।’
রায়ে আরও বলা হয়, ‘যদি ধর্ষণের শিকার নারীর আঘাত বা ক্ষত গভীর থাকে, সেক্ষেত্রে একজন গাইনোকোলজিস্টের কাছে তাকে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে ঠিক কোনও কারণে ধর্ষণের শিকার নারীর এই গভীর ক্ষতের পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, তা লিখতে হবে। কোনও আঘাত বা ক্ষত না থাকলে ধর্ষণের শিকার নারী, শিশু ও তরুণীর ক্ষেত্রে স্পার্স স্পেক্যুলাম (এক ধরনের যন্ত্র, যা দিয়ে যৌনাঙ্গ এলাকায় পরীক্ষার করা হয়) পরীক্ষা করা যাবে না।’
রায়ে হেলথ কেয়ার প্রটোকল ব্যাপকভাবে প্রচার এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে বিশেষ করে চিকিৎসক, আদালত, পাবলিক প্রসিকিউটর (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল), ধর্ষণ মামলায় পুলিশের সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা, উৎসাহী আইনজীবীর কাছে সরবরাহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে হেলথ কেয়ার প্রটোকল বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সেমিনার করতে বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এর আগে ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্র্যাক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নারীপক্ষ নামে ছয়টি পৃথক সংগঠন ও দুজন ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার নারীর ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’-এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা, এই বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন।
পরে ওই রিটের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র সচিব বরাবর রুল জারি করেন। সেখানে ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ কেন আইনানুগ কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং অবৈধ হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচিবকে কন্যাশিশু ও নারীদের ধর্ষণের পরীক্ষার বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন আদালত। তখন তিন মাসের মধ্যে এই কমিটিকে একটি খসড়া নীতিমালা করে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়। এ নির্দেশের পর সরকার হেলথ কেয়ার প্রটোকল নামে একটি গাইডলাইন তৈরি করে।
এরপর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে মামলাটি রুল শুনানির জন্য আসে। সেই শুনানি শেষে আদালত ধর্ষণের শিকার নারীর ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’-পদ্ধতি নিষিদ্ধ করে রায় ঘোষণা করলেন।








