‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ নিষিদ্ধ হওয়ায় নারীর মর্যাদা রক্ষা পেয়েছে

তাসকিনা ইয়াসমিন
১৩ এপ্রিল ২০১৮, ২০:৫৬আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৮, ২১:০০







আদালত একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কিনা তা নিরীক্ষণে ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ নিষিদ্ধ করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে নারীর মর্যাদা রক্ষা পেয়েছে বলে মনে করছেন এই রিটের সঙ্গে জড়িত আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও নারী নেত্রীরা। তারা বলছেন, পুলিশকে কী করতে হবে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কী ব্যবস্থা নিতে হবে, তা রায়ে বলা হয়েছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব রায় বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না পুলিশের গাইডলাইন তৈরি হবে, পুলিশ, চিকিৎসক, আইনজীবীদের ট্রেনিং দেওয়া না হবে ততক্ষণ এটা তেমন কাজে লাগবে না। এমনকি রায়ের সুফল পেতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার।
আইনজীবীরা বলছেন, রায় বাস্তবায়ন করা গেলে থানা ধর্ষণের শিকার নারীকে আগের মতো বিব্রতকর প্রশ্ন যেমন করতে পারবে না, ঠিক একইভাবে মেডিক্যাল পরীক্ষার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে। ধর্ষণের শিকার নারী নারীবান্ধব পরিবেশ পাবে।
‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পদ্ধতিতে নারী কুমারী কিনা এবং যৌন সম্পর্কে অভ্যস্ত কিনা, ধর্ষণের কারণে তার সতীচ্ছদ ছিঁড়ে গেছে কিনা, তা পরীক্ষা করা হতো। যে পরীক্ষা ধর্ষণের শিকার বিবাহিত নারী ও যৌনকর্মী নারীর জন্য সম্মানজনক নয়।
এই ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পদ্ধতির পরীক্ষাকে অবৈজ্ঞানিক, অমানবিক ও অনৈতিক ব্যাখ্যা করে নারী ও মানবাধিকারকর্মীরা ২০১৩ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। অবশেষে গত বৃহস্পতিবার (১২ এপ্রিল) এই টেস্ট নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি এ কে এম সহিদুল হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ।
রায়ে আদালত বলেন, “ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুর শারীরিক পরীক্ষার জন্য ক্ষেত্রে এই ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’-এর বিজ্ঞানসম্মত কোনও ভিত্তি নেই। এ ধরনের পরীক্ষা অযৌক্তিক এবং এভাবে পরীক্ষা ভিকটিমকে আবার ধর্ষণ করার শামিল। তাই এ পরীক্ষা বাতিল করতে হবে।”
এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার ভিকটিমদের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে একধাপ অগ্রগতি হলো। এটা আমাদের অনেক দিনের দাবি ছিল। প্রথমত একটা মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে তাকে বড় ধরনের ট্রমার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এরপর তার মেডিক্যাল পরীক্ষার সময়ও তাকে ট্রমার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। থানাকে একই কথা তাকে বারবার বলতে হয়। সেইগুলো থেকে বেরিয়ে আসার কথা এই রায়ে বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, “জাতিসংঘের গাইডলাইন মেনে এটা করা হয়েছে। থানা তাকে আর এখন ওইভাবে প্রশ্ন করবে না। রায়র মাধ্যমে মেডিক্যাল পরীক্ষার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে। ধর্ষণের শিকার মেয়েটি নারীবান্ধব পরিবেশ পাবে। কোর্টে আসামি পক্ষের আইনজীবী যেভাবে বার বার মেয়েটাকে ‘নষ্ট মেয়ে’ প্রমাণ করতে চায়, তা এখন আর করতে পারবে না। এই বিষয়গুলো থেকে মেয়েরা এখন সহযোগিতা পাবে।” তবে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি এ-ও বলেন, ‘বাংলাদেশের বাস্তবতায় এগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের খুশি হওয়ার সুযোগ নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত না পুলিশের গাইডলাইন হবে, পুলিশ, চিকিৎসক, আইনজীবীদের ট্রেনিং দেওয়া হবে ততক্ষণ এটা তেমন কাজে লাগবে না। এটার সাফল্য দেখতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ট্রেনিংগুলোর ব্যবস্থা করা দরকার।’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ সাধারণ সম্পাদক ও অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা বেগম রোজী বলেন, “আমরা কিছু সংগঠন ২০১৩ সালে ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’-এর বিষয়টি নিয়ে রিট করি। তখন আমরা বলেছি যে ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে যে ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ করানো হয় তা অবৈজ্ঞানিক টেস্ট। এ পরীক্ষা পদ্ধতিতে জানা যায় ওই নারী কুমারী নাকি তার যৌন-অভিজ্ঞতা রয়েছে।”
তিনি বলেন, “রিটের জন্যে আমাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সঙ্গে মতবিনিময় হয়। এর মধ্যে ছিলেন গাইনি চিকিৎসক, ফরেনসিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। আমরা চেয়েছি ধর্ষণের শিকার হয়েছে যে মেয়েটি তাকে মেডিক্যাল পরীক্ষা এবং অন্যান্য কারণে আবার ধর্ষণের মধ্যে দিয়ে যেতে না হয়। এখন বিজ্ঞানসম্মতভাবে ধর্ষণের প্রমাণ করা যায়। তাই ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ আর প্রয়োজন নেই।”
মাসুদা রেহানা বেগম আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে আমরা ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে ট্রমা থেকে বের করে আনতে সক্ষম হবো। রায়ে পুলিশকে কী করতে হবে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কী ব্যবস্থা নিতে হবে, তা বলা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার একটি মেয়ে ধর্ষণের বিষয়ে যেটি বলবে সেটিই বিশ্বাস করার কথা। কারণ কোনও ধর্ষণকারী সাক্ষী রেখে ধর্ষণ করে না।’
বিচারকরা যদি ‘জেন্ডার সেনসিটিভ’ না হতেন তাহলে এই রায় পেতাম না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ, প্রশাসন, আইনজীবীদের জেন্ডার সেনসিটিভ হতে হবে। হাইকোর্টের এই যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে আমরা নারীরা একটি বড় হাতিয়ার পেলাম। এটিকে ধরে আমরা অনেক দূর যেতে পারবো।’
আইনজীবী দিপ্তী শিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এমনিতেই ধর্ষণের শিকার মেয়েটি ট্রমাট্রাইজড হয়ে যায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মাঝখানে নারী ডাক্তার ছিলেন না। ফলে মেয়েরা এই মেডিক্যাল টেস্ট করাবে কি করাবে না, এটা নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে যেতো। যদিও পুরুষ ডাক্তাররা বলেন যে তারা নারী নার্স দিয়ে টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট দেন। এরপরও বিষয়টা অমানবিক। এখন এই রায়ের মাধ্যমে এই জায়গাটায় সহায়তা হবে।’
২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর নারী সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), ব্র্যাক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নারীপক্ষ— এই ছয় সংগঠন এবং ডা. রুচিরা তাবাচ্ছুম ও ডা. মোবারক হোসেন খান ধর্ষণের শিকার নারীর ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা, এই বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন। এই পরীক্ষা পদ্ধতি সংবিধানের পরিপন্থী বলে রিটে উল্লেখ করা হয়। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্ট ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার নারীদের ডাক্তারি পরীক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। আদালতে এই রিটের শুনানি করেন ব্যরিস্টার সারা হোসেন।

/ইউআই/এইচআই/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম