নির্বাচনি বাজেট তৈরির কাজে ব্যস্ত অর্থমন্ত্রী

শফিকুল ইসলাম
১৪ এপ্রিল ২০১৮, ১৩:৫৮আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০১৮, ১৫:২৮

 

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত (ফাইল ছবি) আগামী (২০১৮-১৯) অর্থবছরের বাজেট তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তাই দর্শনার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় কমিয়ে দিয়েছেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের নিজ দফতরের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে মন্ত্রীর একান্ত সচিব, সহকারী একান্ত সচিব, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার দরজায় লাগানো হয়েছে বিশেষ নোটিশ। তাতে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় বাজেট প্রস্তুতির জরুরি কার্যক্রম চলায় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ-প্রার্থীদের Appointment নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাজেট তৈরির কাজে সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব বাংলা টিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘নানা ধরনের তদবির আসে। সেই তদবির ঠেকাতে অর্থমন্ত্রী সাক্ষাৎ কমিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া এটি হবে নির্বাচনি বাজেট। তাই সেখানে নানা বিষয় থাকবে। বাজেট সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সেখানে নানা বিষয় সংযোজন-বিয়োজন হয়। এসব বিষয় সংসদে উপস্থাপনের আগে গোপন রাখাই উচিত বলে মনে করি।  তাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মন্ত্রী।’ 

জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাজেটের কাজে মনোযোগ দিতেই দর্শনার্থীদের সাক্ষাৎ কমিয়ে দিয়েছি। বাজেট শেষ হয়ে গেল আবার সাক্ষাৎ করা যাবে।’     

সবকিছু ঠিক থাকলে ৭ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে পারে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। এর আগে ১০ম জাতীয় সংসদের ১৬তম অধিবেশন (যা বাজেট অধিবেশন নামেই পরিচিত) ডাকবেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এ বিষয়ে পুরোপুরি প্রস্তুত অর্থমন্ত্রী নিজেও। এটি হবে আবুল মাল আবদুল মুহিতের একটানা দশম বাজেট। আর তার দেওয়া মোট ১২তম বাজেট। অর্থমন্ত্রী মুহিত এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার শাসনামলে দুটি অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছিলেন।  

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের বছর হবে ২০১৮ সাল। এ বছরের ডিসেম্বরেই হতে পারে ১১তম জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন। তাই এবারের বাজেট হবে সরকারের নির্বাচনি বাজেট। মানুষ খুশি করার বাজেট। জনগণের প্রত্যাশার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রণীত হবে এ বাজেট। তাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা নিয়ে বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক সুযোগ অধিক ব্যবহার, প্রবাসী আয় বাড়ানো ও নতুন রফতানির বাজার অনুসন্ধানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ইতোমধ্যেই আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যদিও অর্থবছর শেষ হবে ২০১৯ সালের ৩০ জুন। তখন রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকবে নতুন সরকার।

সূত্র জানায়, ভোটারদের তুষ্ট করতে নতুন অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যেন ভোটাররা কোনোভাবেই চাপের মুখে না পড়েন। এর অংশ হিসেবেই আগামী বাজেটে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় কর থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আয়কর দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি কমাতে ই-পেমেন্ট ও ই-ফিলিং চালুর  ঘোষণাও থাকতে  পারে আগামী বাজেটে।

অর্থমন্ত্রী আগেই জানিয়েছেন, আগামী বছরের বাজেটের আকার ৫ লাখ কোটি টাকার নিচে থাকবে। সে দিকটি বিবেচনায় রেখে নতুন বাজেটের পরিমাণ বাড়ানো হবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ। সেটি যদি সঠিক হয় তাহলে সেই বাজেটের আকার হতে পারে ৪ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। নতুন বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সম্ভাব্য বরাদ্দ ধরা হতে পারে একলাখ ৭৮ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ আছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, এ বছর পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, দোহাজারী থেকে ঘুনধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, পদ্মা সেতু, মেট্রো লাইন-৬, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ও পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর ও  মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পকে গুরুত্ব দিয়ে বেশি বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই মেগা প্রকল্পের বরাদ্দ ঠিক করা এবং কাজের অগ্রগতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের জন্য সম্ভাব্য বরাদ্দসীমা নির্ধারণ করা হয়।

সূত্র জানায়, আগামী (২০১৮-১৯) অর্থবছরের বাজেটে দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।  সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নে নানা ধরনের পরিকল্পনা নেওয়ার কথাও ভাবছে।  কৃষি, পল্লি উন্নয়ন ও কর্ম সৃজনের পাশাপাশি দেশের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হতে পারে। এক্ষেত্রে রেলপথ উন্নয়ন, বন্দর উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সড়কখাত অগ্রাধিকার পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের সূর্যসন্তান হিসেবে পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় থাকা সব ধরনের ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হতে পারে। একইসঙ্গে বরাদ্দের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন, সরকারি সেবাদানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। 

উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগামী বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সম্ভাব্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে এক লাখ ৭৮ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ আছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। এর আগের বছরে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৯১ হাজার কোটি টাকা। সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয় ৭৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশের সমান। কিন্তু শেষ বাজেটে এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে জিডিপির প্রায় সাত শতাংশ। টাকার অঙ্কে (২০১৪-১৫) অর্থবছরের তুলনায় ১৩৭ শতাংশ বেশি।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ-উপদেষ্টা ড. এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘রামপাল পাওয়ার প্লান্ট ও পদ্মা সেতুসহ বড় প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ বাড়তে পারে।’ তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে একনেক বৈঠকে হাজার হাজার কোটি টাকা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলো এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এতে বরাদ্দ বাড়ছে। তবে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। নির্বাচনি বছরে ব্যয়ের মাত্রা বাড়াতে চাইবে সরকার। কারণ, জনগণের সামনে বলতে পারবে আমরা মানুষের উপকার চাই। এ জন্য ব্যয় বেশি করা হচ্ছে।’

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে জিডিপির পরিমাণ টাকার অঙ্কে দাঁড়াবে ২৫ লাখ ৪৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এই অর্থবছরে জিডিপির আকার হচ্ছে ২২ লাখ ২৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার সহনীয় মাত্রায় থাকবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে অবশ্যই আগামী বাজেটে বেশ কিছু নতুন দিক থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। জনসাধারণের আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই প্রণীত হবে আগামী বাজেট। জনগণ সম্পৃক্ত কর্মসূচিগুলোয় বরাদ্দ বাড়বে। তাদের জন্য নতুন কোনও কর্মসূচিও চালু করা হতে পারে। সরকারের উন্নয়ন সফলতা তুলে ধরে আগামী বাজেটে বড় কোনও প্রকল্প গ্রহণ করা হবে না। তবে সরকারের অগ্রাধিকার পাওয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বরাদ্দ বাড়িয়ে নতুন দিকনির্দেশনা থাকতে পারে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কারণ, জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার কথা বিবেচনায় রেখেই আওয়ামী লীগ রাজনীতি করে।’ কাজেই তাদের সন্তুষ্টিই বড় কথা বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

 

/এমএনএইচ/চেক-এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম