চার কারণে ঝড়ে ভেঙে পড়ছে রাজধানীর গাছপালা

শাহেদ শফিক
২৭ এপ্রিল ২০১৮, ১২:০৫আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৮, ০৮:৩৫

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ঝড়ে উপড়ে যাওয়া একটি গাছ

সামান্য ঝড়ে রাজধানী ঢাকার সড়কের পাশে ও সড়ক বিভাজকসহ বিভিন্ন স্থানে লাগানো গাছপালা ভেঙে পড়ছে। এসব গাছের কোনও পরিচর্চা করা হয় না। অতিরিক্ত ডালপালা ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশও অপসারণ করা হয় না। প্রতিটি গাছের ঢালপালা বেড়ে উঠছে আপন গতিতে। এসব কারণে সামান্য ঝড়ের কবলে পড়লেই ভেঙে পড়ছে গাছগুলো। এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করার বলেছেন উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, গাছ ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ মাটির গুণগত মান পরীক্ষা না করে গাছ লাগানো। তাছাড়া গাছের সঠিক পরিচর্চা না করা, ঝড়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ডালপালা না কাটা এবং ভূপৃষ্ঠে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গাছ ভেঙে পড়ছে। এজন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গাছের পরিচর্চা নেওয়া। তাপামাত্রা বাড়ায় মাটি থেকে বাতাস উপরে চলে যাচ্ছে।

উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নানা স্থানে ঢাকায় গাছ লাগানো হচ্ছে। কখনও রাস্তার পাশে, কখনও সড়ক বিভাজক, আবার কখনো ফুটপাতে। এসব স্থানে পর্যাপ্ত মাটি নেই। গাছের মূল শিকড় মাটির গভীরে যেতে পারে না। ফলে শক্তিহীন হয়ে পড়ে গাছ। আবার যদি লালমাটি হয় সেখানে গাছ শক্তি পায় না। সামান্য বৃষ্টিতে মাটি খুব নরম হয়ে পড়ে। তখন ডালপালাও শক্তি হারায়। বাতাসে ভেঙে পড়ে। এজন্য মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে উপযুক্ত গাছ লাগানো উচিত।’

তিনি বলেন, ‘যখন ডালপালা বড় হয়, বাতাসের গতিবেগ বাড়ে, তখন সেই বাতাসের বেগ তার প্রতিরোধ করার কোনও শক্তি থাকে না। তাছাড়া নগরীতে কোথাও উল্লেখযোগ্য উন্মুক্ত জায়গা নেই। বড় বড় বিল্ডিং রয়েছে। ঝড় যখন শুরু হয় তখন উন্মুক্ত জায়গা না পেলে সামান্য ফাঁকা জায়গা দিয়েই তীব্র গতিতে ছুটে চলে। তখন গাছগুলো দুমুড়ে-মুছড়ে পড়ে। এজন্য গাছের অতিরিক্ত ঢালপালা কাটা উচিত।’

আরও পড়ুন: ঝড়ে লণ্ডভণ্ড মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ

অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ জানান, যেখানে কংক্রিটের স্থাপনা বেশি সেখানে বাতাস উপরে চলে যায়। তখন বাতাসের ঘনত্ব ও ফ্লো কমে যায়। হঠাৎ করে ঝড় শুরু হয়।তাছাড়া অনেক স্থানে কৃষ্ণচূড়ার মতো নরম গাছপালা দেখা যায়। এ ধরনের গাছ ঝড়ের জন্য শক্তিশালী নয়।

জাপান ও চীনের উদাহরণ দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এ দুটি দেশের কোনও কোনও অঞ্চলে মাটির গভীরতা কম। নিচে পাথর রয়েছে। সেসব অঞ্চলে গাছের শিকড়গুলোকে বিশেষ পদ্ধতিতে মাটিতে রাখা হয়। গাছ রোপন করে বৈজ্ঞানিকভাবে ঠেস দেওয়ার মাধ্যমে তারা ঝড় থেকে গাছকে রক্ষা করে। ফলে ঝড় থেকে গাছ রক্ষা পায়। আমাদের দেশে গাছকে প্রটেকশন দেওয়ার প্রবণতা খুবই কম। এ ধরনের ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি।’

রাজধানী ঢাকায় গাছের পরিচর্যায় উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ, সিটি করপোরেশন ও অঞ্চলভিত্তিক দল গঠন করে তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করা যেতে পারে। তাছাড়া যে গাছটি যে সংস্থা লাগিয়েছে সেই গাছের দায়িত্ব সে সংস্থাকেই নেওয়া উচিত বলেও মত দেন অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহাম্মদ।

জানতে চাইলে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটা গাছ লাগানোর পর সবাই মনে করে এর দায় শেষ। এরপর কোনও পরিচর্চা করা হয় না। গাছের অতিরিক্ত ডালপালা কাটা হয় না। ফলে গাছের মূল থেকে মাথা পর্যন্ত অনেক ভারী হয়ে পড়ে। সে বাতাসের গতিবেগ রোধ করতে পারে না। অনেক সময় বিনাবাতাসেও গাছ হেলে পড়ে।’

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ঝড়ের তাণ্ডব তিনি বলেন, ‘এসবের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। কিন্তু সিটি করপোরেশন করছে না। সংস্থা দুটির পরিবেশ সার্কেল নামে একটি দফতর রয়েছে। আসলে তাদের কাজ কী? পরিবেশ অধিদফতরও রয়েছে। পরিবেশের জন্য তারা কী করে?’

সম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, নগরীতে ঝড়ের প্রবণতা বেড়েছে। আগের সময়ের তুলনায় ঝড়ের মাত্রা দিনদিন বাড়ছে। পরিবেশ অধিদফতর জানিয়েছে, গত ২২ এপ্রিল এ বছরের সর্বোচ্চ গতির কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়েছিল ঢাকা। ওই ঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮৩ কিলোমিটার। যা এখন পর্যন্ত বছরের সর্বোচ্চ। ওইদিন প্রবল বাতাসে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ,বিজয় স্মরণী, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা, ধানমন্ডি ও আগারগাঁওসহ বেশ কয়েকটি এলাকার গাছপালা ভেঙে পড়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার (২৬ এপ্রিল) বিকালে আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঝড়ের কারণেই ডালপালাগুলো ভেঙে পড়ে। গাছের ঢালপালা যখন বেশি থাকে তখন বাতাসের গতিবেগ রোধ করতে পারে না।’

নগরীতে কী পরিমাণ গাছ রয়েছে বা এসব গাছের তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা কারা তা নিয়েও সরকারের কোনও সিদ্ধান্ত নেই। তবে কোনও গাছ পুরোপুরি কাটতে হলে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত কমিটির অনুমোদন নিতে হয়। ঝড়ে ভেঙে যাওয়া গাছ অপসারণে এই অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না।

নগরীর কোনও গাছের জন্যই কোনও সংস্থা কাজ করছে না। জীবিত অবস্থায় কোনও গাছের পরিচর্চার দায়িত্ব কেউ নেয় না। কিন্তু ঝড়-তুফানে গাছ ভেঙে পড়ে তখন তার মালিক হয় সিটি করপোরেশন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন যেসব গাছপালা আছে সেগুলোর যথাযথ পরিচার্যা করার মতো লোকবল বা যান-যন্ত্রপাতি আমাদের নেই। কোন গাছ ঝুঁকিপূর্ণ তা-ও নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। তবে সড়কে ভেঙে পড়লে আমরা অপসারণ করি।’

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশন নগরীতে গাছ লাগানো শুরু করে। পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), গণপূর্ত বিভাগ, পরিবেশ অধিদফতর, সড়ক ও জনপদ বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থার লাগানো গাছ রয়েছে। এসব গাছের সঠিক কোনও হিসাব বর্তমান দুই করপোরেশনের কাছে নেই।

বিভিন্ন সময় বৃক্ষরোপণের নামে সড়কের পাশসহ বিভিন্ন স্থানে গাছ লাগানো হয়। কিন্তু এসব গাছ লাগানোর আগে কোনও বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হয় না। মাটিও পরীক্ষা করা হয় না। যে কারণে গাছগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে বেড়ে ওঠে। অনেক সময় ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনার শিকারও হয় অনেকেই। তাছাড়া এই গাছগুলো কোন সংস্থা তদারকি করবে সে বিষয়টিও নির্ধারণ করা হয় না।

জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, ‘আমাদের বৃক্ষরোপণের কোনও জায়গা নেই। এখন সড়ক বিভাজকে কোনও বড় গাছ লাগানো হচ্ছে না। আমরা কিন্তু মাঝে-মধ্যে বর্জব্যবস্থাপনার লোকজনকে দিয়ে আমাদের ঝুঁকিপূর্ণ গাছ বা তার অংশ বিশেষ কেটে ফেলি। এ জন্য আঞ্চলিক পর্যায়ে আমাদের একটি করে কমিটি রয়েছে। আমরা ভবিষ্যতে মাটি উপযোগী গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাছাড়া নগরীতে যেসব সংস্থার মালিকানাধীন গাছপালা রয়েছে সেই সংস্থাগুলো যদি সঠিকভাবে দায়িত্বপালন করে তাহলে গাছের এমন পরিস্থিতি হতো না।’

/এইচআই/আপ-এনআই/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম