রোহিঙ্গা ইস্যুকে গুরুত্বারোপ করে ঢাকা ঘোষণা গ্রহণের মধ্য দিয়ে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) ৪৫তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের দুই দিনব্যাপী সম্মেলন শেষ হয়েছে। রবিবার (৬ মে) দুপুরে সম্মেলনটি শেষ হয়।
দুইদিন ব্যাপী আলোচনা শেষে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাপনী সেশনে এ ঘোষণা গৃহীত হয়।
ঘোষণায় বলা হয়,‘রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর পরিকল্পিত নিষ্ঠুর আচরণের বিষয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং এই আচরণ জাতিগত নিধন পর্যায়ে চলে গেছে।”
ওআইসি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে বলেছে রোহিঙ্গা ঢলের কারণে বাংলাদেশ মানবিক ও নিরাপত্তা সমস্যায় পড়তে পারে।
অনুষ্ঠান শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, এবারে রোহিঙ্গাসহ ১২০টির অধিক রেজ্যুলেশন গৃহীত হয়েছে।
তিনি বলেন, ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসায় ওআইসি চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা দুটো জিনিস চেয়েছিলাম। একটি হচ্ছে, রোহিঙ্গা ইস্যু এবং অন্যটি ওআইসির সংস্কার। আমরা দুটোই অর্জন করতে পেরেছি।’
তিনি জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি করা হবে। যেটি ওআইসিতে জাতিসংঘসহ অন্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে। এছাড়া ওআইসির সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশ এবং তুরস্ক একসঙ্গে কাজ করবে।
ওআইসি মহাসচিব ইউসেফ এ আল উথাইমান বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু বারবার আলোচিত হবে। কারণ, এটি কোনও ধর্মীয় বিষয় নয় বরং এটি মানবিক ও মানবাধিকার বিষয়।
রোহিঙ্গা বিষয়ক মন্ত্রী কমিটি
রবিবার সকালে রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ সেশনে গাম্বিয়ার প্রস্তাবিত একটি রেজ্যুলেশন নিয়ে আলোচনা করার পরে সংশোধনীসহ তা গৃহীত হয়েছে। রেজ্যুলেশনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দায়বদ্ধতার জন্য ওআইসি’র অ্যাডহক মন্ত্রী পর্যায়ের একটি কমিটি কাজ করবে এবং এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করবে গাম্বিয়া।
এর মূল প্রস্তাবে গত বছর ২৫ আগস্টের পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার দায়বদ্ধতার জন্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করার বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে। এছাড়া মানবাধিকার পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে মিয়ানমারের ওপর রাজনৈতিক চাপ নিশ্চিত করার বিষয়টিও মূল প্রস্তাবে উঠে এসেছে।
বিশেষ সেশনে সভাপতিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী এবং সঞ্চালনার দায়িত্ব ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।
অনুষ্ঠানে কানাডার প্রধানমন্ত্রীর রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ দূত বব রে, জাতিসংঘের অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল রশিদ খালিকভ, ওআইসি’র ইন্ডিপেনডেন্ট হিউম্যান রাইটস কমিশনের সভাপতি, আরাকান ইউনিয়নের পক্ষে ড. ওয়াকার উদ্দিন বক্তব্য রাখেন।
এরপর উন্মুক্ত আলোচনায় জিবুতি, ইরান, উগান্ডা, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, ইরাক, মালয়েশিয়া, মিসর, তুরস্ক, কাজাকিস্থান ও সুদানের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী তার বক্তব্যে বলেন,‘আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত চুক্তি করেছি। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য আমরা তৈরি। তবে সমস্যা হচ্ছে ফেরত পাঠানোর জন্য তাদের যে বাড়িঘর তা এখনও তৈরি করা হয়নি।’
বব রে বলেন, ‘আমি যখন কক্সবাজার সফর করেছিলাম তখন রোহিঙ্গারা বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন যেন আমি বিশ্বকে বলি তারা মানুষ। কানাডা দায়বদ্ধতার নীতিতে বিশ্বাসী এবং আমরা জানি এটি জটিল একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।’
রশিদ খালিকভ বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে বেশি কাজ করছে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ। রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু এবং অনেকে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। জাতিসংঘের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে ৯৫১ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।’
ওআইসি’র ইন্ডিপেনডেন্ট হিউম্যান রাইটস কমিশনের সভাপতি বলেন, ‘আমরা ২০১১ সালে থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইন্ডিপেনডেন্ট হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের আলোচনা করছি। আমাদের একটি সুপারিশ আছে, রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি বিশেষ পাথ ফাইন্ডিং কমিশন গঠন করা।’
ওয়াকার উদ্দিন বলেন, ‘আমার জন্ম রাখাইনে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এ ধরনের অত্যাচার আমি জন্ম থেকে দেখে আসছি। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার আহ্বান জানাই।’
জিবুতির প্রতিনিধি বলেন, ‘আমি ৪-৫ বছর আগে রাখাইনে গিয়েছিলাম। আমি তাদের দুঃখ-কষ্ট নিজ চোখে দেখে এসেছি।’
ইরানের প্রতিনিধি বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করছে। আমাদের চেষ্টা করতে হবে টেকসই উপায়ে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর।
উগান্ডার প্রতিনিধি বলেন, ‘আমি জোর দিয়ে বলতে চাই রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার ও শান্তিপূর্ণ বসবাসের অধিকার আছে।’
ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধি বলেন, ‘আমাদের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফর করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছেন।’
পাকিস্তানের প্রতিনিধি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের বিষয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সম্পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করছি।’
ইরাকের প্রতিনিধি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা মানুষ। মিয়ানমার সরকার প্রতি আহ্বান জানাই তাদের মানবাধিকারকে সম্মান করার।’
মালয়েশিয়া প্রতিনিধি বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদের এ বিষয়ে বড় ভূমিকা আছে।’








