পরীক্ষায় ফেল: পাঁচ মাসে ৫ মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

তাসকিনা ইয়াসমিন
০৭ মে ২০১৮, ০৮:৪৬আপডেট : ০৭ মে ২০১৮, ১২:১৪

বাম থেকে বিজয়, ফারুক, মিতু, ফয়সল ও শ্রেয়া (বৃত্ত দিয়ে চিহ্নিত) পরীক্ষায় ফেল করার কারণে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৫ জন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। অকৃতকার্য হওয়ার কারণেই তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকদের ফেসবুক পেজ ‘প্ল্যাটফর্ম’ এর অ্যাডমিন মারুফুল ইসলাম অপু।  তিনি জানান, ৪ মে বগুড়া টিএমএসএস মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী বিজয় কুমার সাহা, ৪ এপ্রিল কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র মেহেদী হাসান ফারুক, ১০ মার্চ রাজধানীর শহীদ মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী তানহা রহমান শ্রেয়া, ১০ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের জান্নাতুল ওয়াদিয়া মিতু ও ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করার পর ফয়সাল এমরান আত্মহত্যা করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেডিক্যাল স্টুডেন্টদের কাছে পরিবারের অনেক বেশি প্রত্যাশা থাকা এবং লেখাপড়ার খুব বেশি চাপ থাকার কারণেই তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।

শুক্রবার (৫ মে) এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষায় গাইনিতে অকৃতকার্য হয়েছে খবর পাওয়ার পরই আত্মহত্যা করেন বগুড়া টিএমএসএস মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী বিজয় কুমার সাহা। এ তথ্য নিশ্চিত করে তার সহপাঠী সুমাইয়া বিনতে রাজ্জাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুক্রবার সকালে বিজয়কে পরিবারের সদস্যরা বাড়ির ছাদে অজ্ঞান অবস্থায় দেখতে পায়। এরপর তাকে তাৎক্ষণিকভাবে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিকেল ৩টার দিকে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।’  

বিজয়ের স্মৃতিচারণ করে সুমাইয়া আরও বলেন, ‘বগুড়া নগরীর ভাণ্ডারি এলাকায় বিজয়ের বাড়ি। মা-বাবা আর প্রিয় ছোটভাইকে রেখে চলে গেল সে। আমরা বিষয়টি মেনে নিতে পারছি না। কেন সে এমন করলো তা নিয়ে আমরা হতবাক! ও অনেক ভদ্র ছেলে ছিল। পরীক্ষার আগের দিনেও ও অনেককে বলেছে যে- যদি আমি এবার ফেল করি, তাহলে আত্মহত্যা করবো। ওর এই কথা শুনে অনেকেই ওকে বুঝিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে তাই করে বসলো!’

তিনি আরও বলেন, ‘ও প্রথমে ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী ছিল। আমরা তৃতীয় ব্যাচে পড়ার সময় আমাদের এখানে (টিএমএসএস) এসে যোগ দেয় সে। পড়াশোনার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিল বিজয়। আমরা সবাই ওকে বলতাম যে, তুমি এত বেশি সচেতন থাক কেন? আমরা পরীক্ষার হলের ভেতরে থাকলে, সে সবসময় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতো। কাকে কী প্রশ্ন করা হয়েছে- সেসব জিজ্ঞেস করতো। আমাদের স্যাররা তাকে বিষণ্ন বালক বলে ডাকতেন। স্যাররা ওকে স্বাভাবিক রাখার অনেক চেষ্টা করেছেন।’

বিজয়ের মৃত্যুতে তার সহপাঠীদের পাশাপাশি তরুণ চিকিৎসকের মধ্যেও শোক নেমে এসেছে। তার প্রতি শোক প্রকাশ করে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রত্যেকটা ভাইভা দিয়ে বের হয়ে দেখতাম- একটি ছেলে কোশ্চেন কালেক্ট করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। অনেকে বিরক্ত হয়ে বকাও দিয়েছে, প্রতিউত্তর করতো না কখনও, মাথা নিচু করে অপমান সয়ে চলে যেতো। এত কষ্ট করে হয়তো এই ফলাফল মানতে কষ্ট হয়েছিল খুব। তাই আর অন্যকে বিরক্ত না করে নিজেই বিদায় নিল আমার বিজয়!’

শাওন আল হাসান নামের একটি আইডি থেকে লেখা হয়েছে, ‘ফার্স্ট ইয়ারে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যালে ছিল। নিতান্তই ব্যক্তিগত কারণে বগুড়ার টিএমএমএস-এ চলে যায়। ফ্যামিলি খুব প্রেসারাইজড করতো ছেলেটাকে।’

সৌমিত্র সৌম্য লিখেছেন, ‘তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধরা হয়েছে পয়জনিং। এটাই কি আসল কারণ! আমরা না হয় নাই জানলাম। তবু বলবো, বেঁচে থাকলে আরও কিছু অর্জন করা যাবে। আর, জীবন একটা পরীক্ষার চেয়ে অনেক বেশি দামি।’

এদিকে, সম্প্রতি আত্মহত্যা করা আরও চার মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণও পরীক্ষায় ফেল করা। ১০ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে আত্মহত্যা করে জান্নাতুন ওয়াদিয়া মিতু। মিতুর মৃত্যুর ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রফ পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হওয়ার পর তা পরিবারকে ফোন করে জানান তিনি। এসময় পরিবারের সদস্যরা খুব উত্তেজিত হয়ে মোবাইলে রাগারাগি করে। ফোন রাখার কিছুক্ষণ পর আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় মিতু। তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।

ঠিক একইভাবে প্রফ পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে শুনেই আত্মহত্যা করেছেন রাজধানীর শহীদ মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী তানহা রহমান শ্রেয়া। তার প্রফ পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে এই খবর শোনার পরই আত্মহত্যা করে। তার বন্ধুরা জানায়- পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ হয়েছে, বাবা-মা ও শিক্ষকদের কী করে মুখ দেখাবে এ ব্যাপারে চিন্তিত ছিল শ্রেয়া। গত ১০ মার্চ আত্মহত্যার আগে এসব বিষয়ে দুঃখ করছেন তিনি। শ্রেয়ার বাড়ি নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলায়।

এদিকে এমবিবিএস পাস করেও হতাশার কারণে আত্মহত্যা করেছেন ফয়সাল এমরান। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। তার বন্ধুরা জানায়, এমবিবিএস পাস করার পর চিকিৎসা বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য পড়াশোনা করছিলেন ফয়সাল। কিন্তু বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকবার পরীক্ষা দিয়েও সুযোগ না পেয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। তার বাড়ি চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার থানার আমীরবাগ এলাকায়।

কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ থেকে মেডিসিন বিভাগের টানা ১১ বার পরীক্ষা দেওয়ার পরও পাস করতে পারেননি মেহেদী হাসান ফারুক। এই ক্ষোভে এক পর্যায়ে ৫ এপ্রিল ঝিনাইদহের নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন তিনি।

ফাইনালে ফেল করার ব্যাপারে টিএমএসএস মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী ও নিহত বিজয়ের বন্ধু সুমাইয়া বিনতে রাজ্জাক বলেন, ‘অন্য সময় পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার তুলনায় ফাইনালে অকৃতকার্য হওয়াটা একটু বেশি কঠিন। কারণ সবাই তখন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে যে- “আপনারা এখন থেকে আমাকে চিকিৎসক বলে ডাকতে পারেন।” কিন্ত যে অকৃতকার্য হয়, তার আর সেটা লেখার সুযোগ থাকে না। সে ছয় মাস পিছিয়ে যায়।’

পরীক্ষায় পাস-ফেলের ব্যাপারে গ্যাঁড়াকলে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়ে পরে পাস করে ডেন্টাল সার্জন হয়েছেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন একজন তরুণ ডাক্তার বলেন, ‘আমি প্রথমে সিটি ডেন্টালের ছাত্রী ছিলাম। পরে বাধ্য হয়ে ওই কলেজ পরিবর্তন করে মেন্ডি ডেন্টালে ভর্তি হই। সিটি ডেন্টালে থাকার সময় আমরা যখন প্রথম প্রফে ফেল করেছি তখনই মনে হতো টিচাররা আমাদের আলাদা করে রাখল। এরপর পরীক্ষা যেমনই দেই না কেন প্রত্যেক বছর কোনও না কোনও সাবজেক্টে ফেল। আমি সবসময় লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পেতাম। আমি আমার প্যাথলজি সাবজেক্টে দুই বছর ক্লাস করেছি। কিন্তু আমাকে পরীক্ষায় অ্যালাউ-ই করছিল না। ভাইভার সময় আমাকে বলে যে, তোমাকে ক্লাসে দেখি নাই। তোমার পার্সেন্টেজ নাই। পরে আমার আব্বা আমাকে ঐ কলেজ থেকে ট্রান্সফার নিয়ে অন্য কলেজে নিয়ে আসেন। আমার আব্বা নিজে একজন এমবিবিএস চিকিৎসক, তাই তিনি বুঝতেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অনেক বন্ধুর এখন আট-নয় বছর হয়ে গেছে কিন্তু পাস করে বের হতে পারেনি। আমার এক বন্ধুকে শুধু এক সাবজেক্টেই চার বছর ধরে ফেল করানো হচ্ছে।’

মেডিক্যালে অনেক সময় পাস করা কঠিন হয়ে ওঠার কারণ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় পাস মানে হচ্ছে ৩৩ মার্কস পাওয়া, আর আমাদের মেডিক্যালের পাস মানে ১০০ এর মধ্যে ৬০ পেতে হবে। ৬০ পেলে পাস, না পেলেই সে ফেল। এই জিনিসটা বাইরের মানুষ বোঝে না।’

পরীক্ষার ফেলের কারণে আত্মহত্যার প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যেকোনও ছাত্রর ওপরেই চাপ থাকে। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের ওপর চাপটা আরও বেশি থাকে। তাদের ওপর অ্যাকাডেমিক ও সামাজিক চাপ বেশি থাকায় দুই মিলিয়ে অনেকেই চাপটা নিতে পারে না। কখনও মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, বন্ধু ও পরিবারের সহযোগিতা যদি সে না-পায় তখন তার মধ্যে বিষণ্নতা চলে আসতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখনও অনেক মেডিক্যাল শিক্ষার্থী এই ঝুঁকির মধ্যে আছে। সেই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য মেডিক্যাল কলেজগুলোতে শিক্ষকগুলোকে সচেতন হতে হবে। তারা মেডিক্যাল কলেজগুলোতে কাউন্সেলিং সেবা, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো ফলোআপের মধ্যে রাখতে পারেন।’

 

/এএইচ/আপ-এসটি
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম