ঈদযাত্রায় দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না সড়ক পথের যাত্রীদের

শাহেদ শফিক
৩১ মে ২০১৮, ১২:১৩আপডেট : ৩১ মে ২০১৮, ১২:১৫

সড়কের বেহাল দশা (ফাইল ফটো) ঈদে প্রতিবারের মতো এবছরও দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না সড়ক পথের যাত্রীদের। বেহাল সড়কে ঈদ আনন্দ ম্লান হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হলেও সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগ (এইচডিএম) বলছে, এখনও সড়ক-মহাসড়ক ও জেলা সড়কের এক- চতুর্থাংশই ভাঙাচোরা। মহাসড়কের মধ্যে সব চেয়ে বেশি খারাপ চার লেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম ও জয়দেবপুর-ময়মনসিং সড়ক। এ অবস্থায় পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের ঈদ যাত্রায়ও সড়ক পথের যাত্রীদের ভয়াবহ দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

সওজ সূত্র জানিয়েছে, সংস্থাটির আওতায় সারাদেশে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জেলা সড়ক ক্যাটাগরিতে ২১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে আসন্ন ঈদ ও নতুন অর্থবছর উপলক্ষে পুরো সড়কের ১৭ হাজার ৯৭৬ দশমিক তিন কিলোমিটারের ওপর জরিপ করেছে সংস্থাটি। গত বছরের নভেম্বর থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে এই জরিপ শেষ করা হয়।

 জরিপের তথ্য মতে, তিন হাজার ৮২১ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগ জরিপ করেছে তিন হাজার ৭৬০ দশমিক ৮ কিলোমিটারের ওপর। এর মধ্যে দুই হাজার ১৪৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার মহাসড়ক ভালো, ৮১৩ কিলোমিটার মহাসড়ক মোটামুটি, ৩৭৬ দশমিক ১ কিলোমিটার মহাসড়ক দুর্বল, ১৮৩ দশমিক ২ কিলোমিটার মহাসড়ক খারাপ এবং ২৩৯ দশমিক ৯ কিলোমিটার মহাসড়কের অবস্থা খুব খারাপ।

এছাড়া, চার হাজার ২৪৬ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে তিন হাজার ৮২১ কিলোমিটার সড়কে জরিপ করা হয়। এর মধ্যে দুই হাজার ১৬৫ দশমিক ৩ কিলোমিটার মহাসড়ক ভালো, ৭৩৬ দশমিক ৮ কিলোমিটার মহাসড়ক মোটামুটি, ৩৯৮ দশমিক ১ কিলোমিটার মহাসড়ক দুর্বল, ২৩১ দশমিক ৬ কিলোমিটার মহাসড়ক খারাপ এবং ২৯৪ কিলোমিটার মহাসড়কের অবস্থা খুবই খারাপ।

অন্যদিকে, ১৩ হাজার ২৪২ কিলোমিটার জেলা সড়কের মধ্যে ১০ হাজার ৩৯৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার সড়কের ওপর পরিচালিত জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উল্লিখিত সড়ক পথের মধ্যে পাঁচ হাজার ৩২৬ দশমিক ২ কিলোমিটার  সড়ক ভালো, ২ হাজার ৫৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার সড়ক মোটামুটি, এক হাজার ৩৫২ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক দুর্বল, ৬৫৮ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক  খারাপ এবং এক হাজার ৯ দশমিক ৩ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ।

সব মিলিয়ে জরিপকৃত সড়কের নয় হাজার ৬৪০ দশমিক ১ কিলোমিটার (৫৩.৬৩%) ভালো, তিন হাজার ৬০৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার (২০.০৫%) মোটামুটি, দুই হাজার ১১৫ দশমিক ৪ কিলোমিটার (১১.৭৭%) দুর্বল, এক হাজার ৭৩ কিলোমিটার (৫.৯৭%) খারাপ এবং এক হাজার ৫৪৩ দশমিক ২ কিলোমিটার (৮.৫৮%) খুবই খারাপ রয়েছে।

সড়কের এই চিত্র গতবছরের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও খুব খারাপ রাস্তাও আগের বছরগুলোর তুলনায় বেড়েছে। সওজ জানিয়েছে, ২০১৫-১৬ সালে সড়ক-মহাসড়কের মাত্র ১৯ দশমিক ৬৪ ভাগ ছিল ভালো। ২০১৬-১৭ সালে ১৬ হাজার ২২০ কিলোমিটার রাস্তার ৩৯ ভাগ ছিল ভালো।

প্রতিবেদনে খারাপ রাস্তা বলতে বোঝানো হয়েছে— যেসব সড়কের পেভমেন্ট ভেঙে গেছে, বড় বড় ফাটল ও খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। খুব খারাপ সড়ক বলতে যানবাহন চলাচলে খুব সমস্যা হয় বা চলাচলের অযোগ্য সড়ক। এগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত ও পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। তা না হলে আসন্ন ঈদযাত্রায় এর প্রভাব পড়তে পারে।

সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানান, গত বছরের তুলনায় এবছর সামান্য উন্নতি হলেও দুর্ভোগে থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না। খোদ সড়ক পরিবহন মন্ত্রীও সড়কের এই উন্নতিতে সন্তুষ্ট না। মঙ্গলবার (২৯ মে) দুপুরে মন্ত্রী নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন— ‘দেশের সর্বত্র সড়ক মহাসড়কগুলোর যে চিত্র, তাতে আমি মন্ত্রী হিসেবে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। সারাদেশের সড়ক ও মহাসড়কের জরুরি মেরামত কাজ আগামী ৮ জুনের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে দেশে সড়ক ব্যবস্থাপনা অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে এখন অনেক ভালো।’

সওজ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে রাস্তার ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশের অবস্থা বেহাল। মহাসড়কের ৫৭ দশমিক ১৩ ভাগ ভালো হলেও সারাদেশে এক হাজার ৭৩ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খারাপ এবং দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ ও চলাচলের অযোগ্য। গত বছর (২০১৭) এ সময়ে মহাসড়কে ভালোর পরিমাণ ছিল ৩৯ ভাগ রাস্তা। তার আগের বছরে (২০১৬) মাত্র ১৯ ভাগ রাস্তা ভালো ছিল।

প্রতিবেদনে আরও  বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ও ভাঙাচোরা এসব সড়ক মেরামত ও পুনর্নির্মাণের জন্য আগামী পাঁচ বছরে ২১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দরকার। আগামী অর্থবছরে প্রয়োজন ১৫ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। আগের বছর এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ১২ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল। তবে এ  অর্থবছরে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র এক হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।

মহাসড়কের মধ্যে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক হচ্ছে— চার লেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম ও জয়দেবপুর-ময়মনসিং মহাসড়ক। এই সড়ক দুটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ সড়কের অবস্থা খারাপ। তাছাড়া, উত্তরাঞ্চলের ২২টি জেলার ৬২ স্থানে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক বিলীন হয়ে গেছে। ৬৭ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক বন্যায় তলিয়ে যায়। পাঁচ হাজার ১১৫ কিলোমিটার মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সওজ-এর একজন প্রকৌশলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সড়ক মেরামতের জন্য যে পরিমাণ বরাদ্দ পাওয়া দরকার, ঠিক সে পরিমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া বন্যার কারণে অনেক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলো ভালোভাবে মেরামত করা যায়নি। অন্যদিকে, মহাসড়কগুলোতে প্রতিটি ট্রাকের ওজন বহনের ক্ষমতা ১৫টন। কিন্তু মালিক-শ্রমিকদের চাপের মুখে ২২ টন পণ্য পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৭০-৮০ টন পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের নজির রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহাসড়গুলোর আয়ু ধরা হয় ২০ বছর। কিন্তু মাত্র দুই বছরেই সেগুলো ভেঙে যাওয়া অবিশ্বাস্য। কর্তৃপক্ষের অবহেলা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও নির্মাণ ত্রুটি ছাড়া এটা হতে পারে না। এজন্য কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক হতে হবে। আর সড়কে ভারী যানবাহন প্রতিরোধ করতে হবে।’

সওজের কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারের পরিচালক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, বিভিন্ন কারণেই সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার মধ্যে পিচ ঢালাইয়ের সময় ৪৮ ঘণ্টা কিউরিং টাইম রাখতে হয়। এ সময় সড়কে কোনও পরিবহন চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু বিকল্প সড়ক না থাকায় আমাদের দেশে এটা মানা হচ্ছে না। ফলে নির্মাণের পরই রাস্তা খুলে দিতে হয়। যে কারণে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রতিবছরই ঈদের সময় সড়ক পথের বেহাল দশার কারণে অনেক যাত্রীকে পথে আটকা পড়তে হয়। সড়ক পথ পরিণত হয় ‘নরকে’। সড়কের নির্মাণ ও সংস্কারে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চরম অবহেলা ও অনিয়মের কারণে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও কোনও লাভ হচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন,‘ঈদের যাত্রায় প্রতিবছর প্রায় এককোটি ১৫ লাখ মানুষ রাজধানী ছেড়ে যান। এরমধ্যে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ যান সড়ক পথে। কিন্তু ওই সময় যে পরিমাণ যাত্রীর চাপ থাকে, সে পরিমাণ পরিবহন নেই। এর সঙ্গে সড়কের দুরাবস্থার কারণে যানজট আরও দীর্ঘ হয়। এবছরও বিভিন্ন স্থানে সড়কের দুরাবস্থার খবর পাচ্ছি। অতি দ্রুত এর মেরামত করা না হলে ঈদযাত্রায় মানুষের আনন্দ মলিন হয়ে যেতে পারে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারাদেশে সড়কের অবস্থা খারাপ। আসন্ন ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের আশঙ্কা রয়েছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় যদি এখনই ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে মানুষের ঈদ আনন্দ মাটি হয়ে যাবে।’

 

/এপিএইচ/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম