বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বড় বড় প্রকল্প গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক খাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে উদ্যোগগুলো নিয়েছেন, তার প্রশংসা করেছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের গত দুই মেয়াদে বাংলাদেশের ম্যাক্রো অর্থনীতিতে বেশ স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। এর মধ্য দিয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উন্নীত হওয়ার পথে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ।
শেখ হাসিনার সরকার সঙ্গতিপূর্ণ নীতি গ্রহণ করেছেন, বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য অবিরত উন্নয়ন প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সাহসী ও প্রশংসাযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে মনোযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ।
দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)-এর সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার গঠনের পর জ্বালানি সংকট ও ব্যবসা সম্প্রসারণে অবকাঠামোগত স্বল্পতার মতো প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তরিকতার সঙ্গে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থানের জন্য নতুন বিনিয়োগের দুয়ার খুলে গেছে। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কর্মসংস্থান খুব জরুরি।’
‘উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাগ্রহণ করে। সেসময় দেশে ৪,৯৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১৩ হাজার মেগাওয়াটকে ছাড়িয়েছে। গত ৭ জুলাই নাগাদ বাংলাদেশ ১১ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
শফিউল বলেন, ‘এ ধারাবাহিক উন্নতি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা কুড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে এগুলো সম্ভব হয়েছে।’
জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রফতানি আয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের মতো অর্থনৈতিক সূচকগুলোর ক্ষেত্রে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা দৃঢ় বিনিয়োগ নীতিমালার মাধ্যমে জোরালো হচ্ছে।
শফিউলের মতো পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) এর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুরও মনে করেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আওতাধীন পরিকল্পনা কমিশন ভালো কাজ করেছে, এক্ষেত্রে ঐক্য দেখা গেছে। পাঁচ বছরের পরিকল্পনা তৈরি ও উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণে এটি যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের ম্যাক্রো অর্থনীতিতে দৃঢ় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নেপথ্যের কারণ হলো— দৃঢ় রাজস্ব নীতি।’ মনসুর আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বেশিরভাগটাই ভালো ও সফল। এর মধ্য দিয়ে গত কয়েক বছরে ডলারের আয় বেড়েছে।’
সামনে এগিয়ে যাওয়া
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনটিএডি) এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ৩৯.১১ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৩ সালে এর পরিমাণ ছিল ৯৭৪ ডলার। ২০১৬ সালে তা বেড়ে ১,৩৫৫ ডলারে দাঁড়ায়। ঊর্ধ্বমুখী এ গতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার জন্য নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়। এগুলো হলো- মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানব সম্পদ উন্নয়ন সূচক ও ইকোনমিক ভালনার্যাবিলিটি ইনডেক্স।
মনসুর বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল। কিন্তু ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সফলতা লাভের মধ্য দিয়ে এটি অর্জন সম্ভব।’ তিনি মনে করেন, দেরি হলেও কিছুসংখ্যক বড় প্রকল্পের অগ্রগতি সময়মতোই হচ্ছে। মনসুর বলেন, ‘আশা করা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই প্রকল্পগুলো সমাপ্ত হবে। যখন এ প্রকল্পগুলো শেষ হবে, তখন এখানে ব্যবসা করার ওপর শিথিলতা আনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।’
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের জিডিপিতে দৃঢ় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। গত অর্থ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৬৫ শতাংশ। ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে ৭.৮ শতাংশ জিডিপি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি সঠিক পথেই আছে; অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য নেওয়া বড় বড় প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করা বিশেষ করে পদ্মা সেতু ও ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে নির্মাণ প্রকল্পগুলো শেষ করার মধ্য দিয়ে আসন্ন বছরগুলোতে অর্থনীতি ক্রমাগত সমৃদ্ধ হবে।’
আব্দুস সালাম বলেন, ‘সারাদেশে পরিকল্পিত ১০০টি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড)-এর মধ্যে কিছুসংখ্যকের কাজ শেষ করাকে প্রাধান্য দিয়েছে সরকার। দেশ ও দেশের বাইরে থেকে বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করে আমরা যদি নিজেদের প্রস্তুত করতে থাকি, তবে বাংলাদেশে বিনিয়োগজনিত কোনও ঘাটতি থাকবে না।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন এখন আর কোনও কল্পনা নয়। এটি এখন বাস্তব। এখন কৃষকরা বাড়িতেই বসেই জানতে পারেন— তার উৎপাদিত পণ্যের বাজার মূল্য কত। বিভিন্ন সেবাখাতে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করার কারণে কাজকে সহজ করেছে, ঝামেলামুক্ত করেছে। আইসিটি খাতের উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগী হওয়ার কারণে বাংলাদেশ আইসিটি আউটসোর্সিংয়ের হাবে পরিণত হয়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের মোট আউটসোর্স অনলাইন কর্মীর প্রায় ১৬.৮ শতাংশই বাংলাদেশি। এদিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়। ২৪.৬ শতাংশ নিয়ে প্রথম অবস্থানে আছে ভারত।
প্রফেশনাল আউটসোর্সিং ট্রেনিং প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৩ হাজার বেকারকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। আইসিটির গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ক্ষেত্র- গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট এবং ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১১,৯২০ জন এরইমধ্যে তাদের প্রশিক্ষণ শেষ করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ শিশু মৃত্যুহার কমানো, লৈঙ্গিক সমতা আনয়ন ও প্রত্যাশিত আয়ুর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এটি হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও সামাজিক নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের ফলাফল।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালের বৈশ্বিক লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো হয়েছে। বৈষম্যের দিক দিয়ে আগের অবস্থান ৪৭ তম হলেও নতুন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৭১। বাংলাদেশিদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৭২ বছর। ভারতে প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৬৮। গত ২৫ বছরে শিশু মৃত্যুহারও ৭৩ শতাংশ কমিয়েছে বাংলাদেশ। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সফলতা পাওয়া গেছে।








