পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে রাজধানীর সড়কগুলোতে প্রায় ১১ হাজার মিনি ওয়েস্টবিন (ডাস্টবিন বা ময়লা ফেলার পাত্র)বসিয়েছিল সিটি করপোরেশন। স্থাপনের পর এসব বিনের অধিকাংশই উধাও হয়ে গেছে। শহরঘুরে দেখা গেছে,স্থাপন করার পর বেশিরভাগ বিন চুরি হয়েছে। কিছু ডাস্টবিন ব্যবস্থাপনার অভাবে অকেজো হয়ে পড়েছে। টিকে আছে যে বিনগুলো সেগুলোর অবস্থাও জরাজীর্ণ। মেরামত বা পুনঃস্থাপন করার কয়েকদিন পরই হয় সেগুলো ভেঙে যায় না হয় চুরি হয়ে যায়। আবার, ভালো বিনগুলোতে ফেলা ময়লা পরিষ্কারও করা হয় না। ফলে বিনগুলো কোনও কাজেই আসছে না। বরং মেরামত আর পুনঃস্থাপনে খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগরজুড়ে এসব বিন স্থাপনের আগে এর সুফল বা কুফল নিয়ে মাঠ পর্যায়ের জরিপ পরিচালনা করা হয়নি। পরিকল্পিতভাবেও লাগানো হয়নি এসব বিন। ক্রয়েও ছিল না স্বচ্ছতা। এ অবস্থায় সরকারের রাজস্ব অডিট অধিদফতরও এই ক্রয়ে অনিয়মের আপত্তি জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে এই ক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ থেকে আপত্তিকৃত অর্থ আদায় করে চালানের মাধ্যমে করপোরেশনের তহবিলে জমা দিতে।
ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্র জানিয়েছে,নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ২০১৬ সালে রাজধানীর সড়কগুলোতে এক যোগে প্রায় ১১ হাজার মিনি ডাস্টবিন বসানো হয়। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০০টি করে মোট পাঁচ হাজার ৭০০ মিনি বিন বসানো হয়। উত্তর সিটি করপোরেশনেও বসানো হয় সম পরিমাণ বিন।
দুই সিটি করপোরেশনে বিনগুলো বসানোর কিছুদিন পরই সেগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন নগরবাসী। তাদের অভিযোগ, বিনগুলো পরিষ্কার করা হয় না বলেই তারা সেগুলোতে খুব একটা ময়লা ফেলেন না। ফলে অধিকাংশ বিনই খালি পড়ে থাকে। ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে বিনের নিচে ও আশপাশে। নগরবাসীর অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। অনেক বিনেই কয়েকদিনের ময়লা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। তাছাড়া অনেক বিনই চুরি হয়ে গেছে। কয়েকবার সংস্কার ও চুরি হওয়ার পর দুই সিটি করপোরেশনে বসানো অনেক ডাস্টবিন পুনঃস্থাপন করতে হয়েছে।
সম্প্রতি ফুটপাতের এসব মিনি ডাস্টবিন নিয়ে জরিপ চালিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শকদের দিয়ে চালানো এ জরিপে দেখা গেছে, সংস্থার ৫ হাজার ৭০০টি বিনের মধ্যে ৫১ শতাংশ বিন রয়েছে। বাকি ২৭ শতাংশ বিন এখন মেরামতযোগ্য, আর ২২ শতাংশ বিনের কোনও হদিস নেই। একই চিত্র ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও (ডিএনসিসি)। সংস্থাটি এ নিয়ে কোনও জরিপ না চালালেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, মিনি বিনের এই বেহাল দশার অন্যতম কারণ ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা। ফুটপাতে দোকান বসানোর জন্য অনেক বিন ভেঙে ফেলেছেন তারা। কখনও কখনও কোথাও কোথাও ভাঙতে না পেরে বিনের মুখ উল্টো করে রাখা হয়, যেন কেউ বিনে ময়লা না ফেলে। অনেক সময় বিনের মুখ পলিথিন বা অন্য কিছু দিয়েও বেঁধে দেওয়া হচ্ছে।
বাংলা ট্রিবিউনের হাতে পৌঁছা সরকারের অডিট আপত্তিতে দেখা গেছে,পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ার লক্ষ্যে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড থেকে তিন ধাপে ১৭ হাজার ১০০ মিনি ডাস্টবিন তৈরি করে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম ধাপে ৫ হাজার ৭০০ বিনের জন্য ৬১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। এর ৭দিন পর আরও ৫ হাজার ৭০০ বিনের জন্য ৬৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। এর এক সপ্তাহ পর আরও ৫ হাজার ৭০০ বিনের বিপরীতে নতুন করে ৬৩ লাখ টাকা পরিশোধ করে ডিএসসিসি। তিন ধাপে ১৭ হাজার ১০০ বিনের জন্য সর্বমোট এক কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ করা হয়। পুরো এই ক্রয় ও ব্যয়ে আপত্তি জানিয়েছে সরকারের অডিট অধিদফতর। বিষয়টি নিয়ে সংস্থাটি বেশ কয়েকবার আপত্তি জানিয়ে ডিএসসিসিকে পত্র দিলেও কোনও জবাব পায়নি।
ডিএসসিসির ক্রয় নিয়ে অডিট অধিদফতরের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের নিরীক্ষায় দেখা গেছে,অপরিকল্পিতভাবে ওয়েস্ট বিন ক্রয় পূর্বক স্থাপন করায় করপোরেশনের এক কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বলা হয়েছে, ডিএসসিসির যেসব এলাকায় বিনগুলো সরবরাহ করে স্থাপন করা হয়েছে তার অধিকাংশই খোয়া বা চুরি হয়ে গেছে। জনসাধারণও বিনগুলো ব্যবহারে উৎসাহিত বা অভ্যস্ত নয়। ফলে এসব বিনের ক্রয় পরিকল্পনা সঠিক ও যথার্থ হয়নি। মাঠ পর্যায়ে জরিপ করে পরিকল্পিতভাবে এই ক্রয় সম্পন্ন না করায় করপোরেশনের এমন আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ডিএসসিসি অডিট অধিদফতরের নিরীক্ষা জিজ্ঞাসাপত্র গ্রহণ করা হলেও কোনও জবাব দেয়নি। এ অবস্থায় আপত্তি সঠিক বলে মনে করছে সংস্থাটি।
নিরীক্ষার সুপারিশে বলা হয়েছে, খুব দ্রুত আপত্তির অর্থ দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে আদায় করে তা করপোরেশনের তহবিলে চালানের মাধ্যমে জমা দিয়ে চালানের সত্যায়িত কপি ও ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ জবাব নিরীক্ষা অধিদফতরে পাঠানোর অনুরোধ করা হলো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো.সাখাওয়াৎ হোসেন বিষয়টি নিয়ে কোনও কথা বলতে রাজি হননি। তবে অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, বিনগুলো ভাণ্ডার ও ক্রয় বিভাগ থেকেই কেনা হয়েছে। এর সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ যুক্ত নয়। তবে আমরা বিনগুলো স্থাপনের মাধ্যমে আমরা নগরবাসীকে সচেতন করতে চেয়েছি। তার দাবি, অডিটের আপত্তি যুক্তিসঙ্গত নয়।








