পরিবেশ দূষণ না করেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চলছে চীনে। চীনের বেইজিং থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে ডাটাং ওভারসিজ অ্যান্ড ইলেক্ট্রিক টেকনোলজির একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেখানে ছাই নেই, ধোঁয়া নেই, নেই কোনও কয়লার চিহ্নও। এমনকি সামান্য শব্দও বাইরে থেকে শোনা যায় না। একই মডেল অনুসরণ করা হবে বাংলাদেশের কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রায়ও। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০১৯ সালে উৎপাদনে আসবে।
সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি’র আমন্ত্রণে চীন সফরে যান দেশের প্রধান সারির সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকরা। গত ৪ থেকে ৮ জুলাইয়ের সফরের সময় চীনের বেইজিং থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ডাটাং ওভারসিসের বিদ্যুৎকেন্দ্রে গিয়ে পরিবেশ দূষণের কোনও চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ৩০০ মেগাওয়াট করে মোট ৬০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট পরিচালনা করছে ডাটাং। বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে যাওয়ার সময় সারা রাস্তায় চোখে পড়েছে সারি সারি সবুজ গাছ। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরেও সবুজের ছড়াছড়ি। একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে ডাটাংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডাইং ইয়াং বলেন, ‘আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেই পরিবেশকে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ঠিক রেখেই কাজ করা হয় এখানে। কোনও ক্ষেত্রে যেন ব্যত্যয় না ঘটে, সে বিষয়ে সবসময় সরকার নজরদারি করে। আমরা যেমন পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে বাতাসে অ্যাশ ছাড়ি না, ঠিক একইভাবে কার্বন উচ্চমূল্যে বিক্রি করি। একইভাবে এখানের গরম বাতাস শিল্প কারখানার কাছে বিক্রি করা হয়।’
ইয়াং বলেন, ‘বাংলাদেশের পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবো আমরা। পায়রায়ও সব মানদণ্ড ঠিক রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।’ যখন বিশ্বব্যাপী প্রচারণা রয়েছে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ থেকে চীন সরে আসছে, তখন ইয়াং বলছেন, প্রচারণাটি ঠিক নয়। তারা নিজেরাও নতুন কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছেন।
সিডিটিও অ্যান্ড এম নামের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) ইয়াং চাকি বলেন, ‘৩০ বছর আগে থেকে আমরা নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনা করছি। আমাদের প্রযুক্তির বিশেষ দিক হচ্ছে পরিবেশ দূষণ না করা।’ প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন থেকেই বিষয়টির গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
সিডিটিও অ্যান্ড এম বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, তাদের কয়লা রাখার স্থানটি স্থায়ীভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে। বাইরে থেকে কয়লা দেখা যায় না। কোনও ছাইও বাইরে থেকে দেখা যায় না। বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে পানি ব্যবহার করে, তাও আবার ঠাণ্ডা করে নদীতে ফেরত পাঠানো হয়। বাইরে থেকে কোনও অ্যাশ দেখা যায় না। কালো ধোঁয়া যেমন নেই, তেমনি কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়েও শব্দ টের পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি পটুয়াখালীর পায়রায় এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। এই কেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে চীনের ডাটাং ওভারসিস ইলেক্ট্রিক টেকনোলজি অ্যান্ড ও অ্যান্ড এম কোম্পানি লিমিটেড। ডাটাং কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক সব মান বজায় রেখে যেমন তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালিত হচ্ছে, একইভাবে চলবে পায়রার বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও।
বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম খোরশেদুল আলম বলেন, ‘পায়রায়ও কয়লা রাখা হবে বড় আকৃতির পুকুরের মধ্যে। যার ওপরে থাকবে ঢাকনা। ফলে বাতাসে কয়লা থেকে কোনও ধুলা ছড়াবে না। একইভাবে পায়রায় এফজিডি (ফ্লু-গ্যাস ডিসালফারাইজার্স) অথবা সালফার অক্সাইডের নিঃসরণ কমানোর জন্য এফজিডি ব্যবহার করা হবে। সালফার অক্সাইডও বায়ুদূষণ করে। কয়লা পোড়ানোর সময় এটি নির্গত হয়। এর ফলে অ্যাসিড বৃষ্টি হয়। মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এটি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে হবে না।’ তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে সর্বশেষ প্রযুক্তি আল্ট্রাসুপার ক্রিটিকাল ব্যবহৃত হবে। এতে কয়লার ব্যবহার কম হবে। বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। তবে পরিবেশ দূষণ হবে না।’
প্রসঙ্গত, আগামী (২০১৯) বছরের মাঝামাঝি সময়ে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথম ইউনিট ও বছরের শেষের দিকে দ্বিতীয় ইউনিট উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক। কেন্দ্রটি নির্মাণে রাষ্ট্রীয় নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি ও চীনের সিএমসি মিলে এই যৌথ মূলধনী কোম্পানিটি গঠন করেছে।
আরও পড়ুন- আড়াই বছরেও মুন্সীগঞ্জের দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরু হয়নি








