মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে দুই দেশের ১০ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় দেশটির সরকার গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ফরেন ওয়ার্কার অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেমের (এসপিপিএ) মাধ্যমে জনশক্তি নিয়োগ স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। একইসঙ্গে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগেরান। কিন্তু এরইমধ্যে ৫৬ এজেন্সির মাধ্যমে দেশটিতে নতুন করে সিন্ডিকেট তৈরির অভিযোগ ওঠে। তবে, এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নতুন করে ৫৬ এজেন্সির সিন্ডিকেট হওয়ার খবর ভিত্তিহীন।’
মন্ত্রণালয় সুত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় নতুন পদ্ধতিতে কীভাবে লোক নিয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রথমবারের মতো জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিং ডেকেছে মালয়েশিয়ান সরকার। আগামী ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর এই কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে অংশ নিতে ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় রয়েছে ৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধি দলে রয়েছেন জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ বুর্যোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক মো. সেলিম রেজা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কর্মসংস্থান) আহমেদ মুনিরুস সালেহীন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মো. দেলওয়ার হোসেন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর একান্ত সচিব আবুল হাসনাত হুমায়ুন কবির, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ শাহিন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক মোশাররফ হোসেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের উপ-সচিব সানজিদা শারমিন।
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, এই জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংয়ের আগে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দফা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের মন্ত্রণালয় পর্যায়ে কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, তা নির্ধারণ করা হয়।
জানা গেছে. মালয়েশিয়ায় অভিবাসন-প্রার্থীদের জন্য সর্বনিম্ন অভিবাসন খরচ, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পুরনো পদ্ধতি বহাল রাখাসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। মূলত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সৃষ্ট ধোঁয়াশা কাটার লক্ষ্যেই দীর্ঘ ১০ মাস পর জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির এই মিটিং নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশটিতে এসপিপিএ পদ্ধতিতে শ্রমিক নেওয়ার বিধানটি গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে অকার্যকরের ঘোষণা দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘মালয়েশিয়া সরকারের সিদ্ধান্ত আমরা বোঝার চেষ্টা করছি। তবে বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার বন্ধ হয়নি।’
মালয়েশিয়ায় বৈঠকের সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অর্থ ও প্রশাসন) আমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে, সেটা নিরসনে কাজ করার ব্যাপারে আলাপ হবে। কারণ মালয়েশিয়া আমাদের জন্য একটি বড় মার্কেট। সব মার্কেটের জন্যই সবার একটি টার্গেট থাকে। সে বিষয়ে আলোচনা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেহেতু তারা কী শর্ত দিচ্ছেন, সেটাও দেখতে হবে। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গেছে মালয়েশিয়া গেছে। তারা যাওয়ার আগে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় মিটিং হয়েছে। সেভাবে প্রস্তুতি নিয়েই তারা গেছেন। তারা ফিরে এলে আশা করছি, ভালো খবরই পাওয়া যাবে। কারণ মালয়েশিয়ায় প্রচুর শ্রমিকের চাহিদা আছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যেন সব এজেন্সি কাজ করতে পারে, সে বিষয়ে আলাপ হবে বৈঠকে।’
এদিকে, সোমবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশি হাইকমিশনের একটি অনুষ্ঠানে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারে কোনও সিন্ডিকেট হবে না। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সব এজেন্সি কাজ করতে পারবে। মঙ্গলবারের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় এ নিয়ে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে আলোচনা হবে। ৫৬ এজেন্সির সিন্ডিকেটের যে অভিযোগ উঠেছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’
অন্যদিকে সিন্ডিকেটমুক্ত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চায় জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রা। বায়রা’র মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মালয়েশিয়া সরকারের সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। এর চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারে না। আমরা দীর্ঘদিন ধরে চাচ্ছিলাম সবাই মিলে কাজ করার। তারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অত্যন্ত সময় উপযোগী। এটা বাস্তবায়নে আর কোনও বাধা আছে বলে আমি মনে করি না। দুই সরকারের মধ্যে মিটিং হবে। তারা যদি মনে করে, আগের সিস্টেমেই পুনরায় লোক নিয়োগ করা যাবে, তাহলে তাই হবে। তারা যদি মনে করে, আগের প্রসেস ঠিক আছে, তাহলে সেইভাবেই হবে। এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে দুই মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। তারা আলোচনাটি করুক, এটা আমরাও চাই। কারণ ১০ মাসের ওপর হয়ে গেছে জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির মিটিং হয়নি। এটা হওয়া খুবই জরুরি। এই মিটিং হলে আমরা স্পষ্ট ধারণা পাবো যে, মালয়েশিয়া সরকার কী প্রস্তাব দিয়েছে এবং আমাদের মন্ত্রণালয় কীভাবে অগ্রসর হতে চায়।’
উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ১ হাজার ১৭৯টি। ২০১২ সালে দুই দেশ শুধু সরকারি মাধ্যমে সরকার টু সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে চুক্তি সই করে। ২০১৬ সালের তা পরিমার্জন করে ১০টি বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিকে জিটুজি প্লাসের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১৬ সালের শেষের দিক থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ শ্রমিক মালয়েশিয়া গেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে জুলাই পর্যন্ত ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬২ জন শ্রমিক পাঠায় বাংলাদেশ।








