সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও বন্ধ হচ্ছে না মানবপাচার। ভারত, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই প্রতিনিয়ত মানবপাচার অব্যাহত রয়েছে। নানা প্রলোভনে পাচারকারীচক্র বিদেশ নেওয়ার কথা বলে সরলমনা মানুষদের পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। পাচারের পর নারী-পুরুষ সকলেই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। জিম্মি করে আদায় করা হচ্ছে মুক্তিপণ। এমনই একটি মানবপাচারকারীচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে লেবাননের বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাচার হওয়া ১৪ জনকে উদ্ধার করে এরইমধ্যে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে লেবাননের বাংলাদেশ দূতাবাস। এরা ইউরোপ যাওয়ার পথে সিরিয়ায় আটক হয়েছিলেন। মানবপাচার কেন বন্ধ হচ্ছে না জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানবপাচার প্রতিরোধে বড় অন্তরায় হচ্ছে অসচেতনতা। যারা বিদেশ যাবেন, নারী হোক আর পুরুষ হোক, তারা যদি সচেতন হোন, তাহলে মানবপাচার বন্ধ না হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে কম।
লেবাননের বাংলাদেশি দূতাবাস থেকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, ‘লেবানন প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী ফরিদা বেগম দূতাবাসকে অবহিত করেন যে তার মেয়ে হ্যাপি আক্তারসহ কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিককে ইউরোপ পাঠানোর কথা বলে শুকুর আলী নামের আরেক লেবানন প্রবাসী বাংলাদেশি সিরিয়ায় পাচার করেছে। এরপর দূতাবাস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধারের লক্ষ্যে সিরিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ অনারারি কনসালকে ই-মেইল ও টেলিফোনে অনুরোধ জানানো হয়। একইসঙ্গে বিষয়টি জর্ডানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসকেও অবহিত করা হয়। পরে জানা যায়, পাচার হওয়া হ্যাপি আক্তারসহ এমন অর্ধশতাধিক বাংলাদেশি সিরিয়ায় রয়েছেন। সেখান থেকে ১৪ জনকে উদ্ধার করে এরইমধ্যে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
আরও ১৫ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে জানিয়ে চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘পাচারকারী শুকুর আলী, নুরু মিয়া ও হানিফসহ মানবপাচারচক্রের সঙ্গে আরও যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত আছে তাদের তথ্য সংগ্রহ করে এই মানবপাচার প্রক্রিয়া যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করা প্রয়োজন।’
র্যাব জানায়, মানবপাচারকারীচক্রগুলো সরলমনা মানুষদের মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে ভারত, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, চায়না, থাইল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, ইউকে, ইউএসএ, ইতালি, কানাডা, বলিভিয়া, মোজাম্বিক, নিউজিল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশে পাচার করে আসছে। সেসব স্থানে পৌঁছার পর তাদের আটক করে অন্ধকার ঘরে নির্যাতন এবং মোটা অংকের টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণের টাকা মেটাতে মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় লিবিয়া, মালয়েশিয়া, উগান্ডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে পাচারকৃত ভিকটিমদের উদ্ধারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে র্যাব। দূতাবাস এবং মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। আটক করা হয় মানবপাচারকারীচক্রের সক্রিয় সদস্যদের। ২০১৭ সালে ৩৮টি অভিযানে মানবপাচারের অভিযোগে ১২৯ জনকে গ্রেফতার করে। পাচার হওয়া ৮৩ জন পুরুষ ও ৫ জন নারীকে উদ্ধার করেছে। এসব ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে ১০৩টি। ২০১৮ সালের গত কয়েক মাসে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযান চালায় র্যাব। এসব অভিযানে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাতজনকে গ্রেফতার করে। পাচারের শিকার ১৩ জন পুরুষ ও চারজন নারীকে উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয় ছয়টি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মানবপাচার রোধে বিশেষ করে নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধে মুখ্য মন্ত্রণালয় হিসেবে কাজ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনের লক্ষ্যে সরকার ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২ করেছে। মানবপাচারের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান করেছে। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২-এর আওতায় ‘মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা-২০১৭’ ও ‘জাতীয় মানবপাচার দমন সংস্থা বিধিমালা-২০১৭’ এবং মানবপাচার প্রতিরোধ তহবিল বিধিমালা-২০১৭ শীর্ষক তিনটি বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রতি দুই মাস অন্তর মানবপাচার, বিশেষত নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয়, আন্তঃসংস্থা এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির সভা জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সেসব সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে মানবপাচার, বিশেষত নারী ও শিশুপাচার প্রতিরোধে প্রতি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কাউন্টার ট্রাফিকিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মানবপাচার কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রথমত যারা পাচার হয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য আমরা সবসময় বলি যে আপনারা যাওয়ার আগে আমাদের সরকারের যে বিধিনিষেধ ও নিয়ম কানুন রয়েছে সেগুলো অনুসরণ করে যাবেন। যারা সেসব নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে যান না, তারাই বেশিরভাগ পাচারের শিকার হন। আমাদের রাষ্ট্রদূতরা তাদের পর্যায়ক্রমে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন। এ কাজটি সাধারণত আমাদের রাষ্ট্রদূতরাই করে থাকেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমরা যেটা করি, ‘এমন কিছু শুনলে আমরা যে এলাকার যারা পাঠিয়েছেন তাদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা করি। যারা পাচার হয়ে যান, ভিকটিম হচ্ছেন, যারা এ ধরনের ভুক্তভোগী হন ও অসুবিধার শিকার হন তারা সাধারণত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশের দূতাবাস তাদের পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেদেশের সরকার নোট পাঠায় যে এ ক’জন লোক আমাদের দেশে ঢুকে গেছে। তোমরা তাদের ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা কর। আমরা সেগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাই। তারা তখন তাদের ফেরত আনার ব্যবস্থা করে। সবকিছুই কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হয়। আমাদের কাছে শুধু তালিকাটা নিশ্চিত করার জন্য পাঠানো হয়। আমরা সেটা নিশ্চিত করে সেখানে পাঠিয়ে দেই। আবার পরবর্তীতে আমাদের কাছে আসে যে এ লোকগুলো ফেরত আসছে, তখন আমরা তাদের যাকে যেভাবে রিসিভ করার সেভাবেই করে থাকি।’
তাদের সুরক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। আমরা যে কাজটি করি আমাদের এয়ারপোর্টসহ বিভিন্ন জায়গায় ইমিগ্রেশনের চেকআপটা করি যে, অরিজিনাল ভিসায় যাচ্ছে কিনা, ঠিকমতো যাচ্ছে কিনা। সেখান থেকে কিন্তু আমরা অনেক কিছুই পেয়ে যাই। তারপরও যারা ফাঁকফোকড় দিয়ে বের হয়ে যায় তারা এই হয়রানির শিকার হন। তিনি বলেন, যারা পাচার হয়, তারা ছোট ছোট জলযানে করে বিভিন্নভাবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায় চলে যেতো। আমাদের কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ ও র্যাব ওইসব পথে অবস্থান নিয়েছে। যে কারণে তারা এসব পথে এখন যেতে পারছে না। আমরা বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে জনবল বাড়িয়ে যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি বাড়িয়েছি। যারা বিদেশ যায় তাদের আমরা বারবার সাবধান করে বলছি, স্বরাষ্ট্র ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয় থেকে তারা যেন বৈধভাবে যায়। আর এক কাজের কথা বলে তাদের অন্য কাজে নিয়ে যাওয়া হলে তারা যেন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে।’








