সব ঠিকঠাক মতো এগোলে আর কিছু দিনের মধ্যেই তামিলনাড়ুর রাজধানী চেন্নাইতে বাংলাদেশ সরকার একটি কূটনৈতিক মিশন চালু করতে যাচ্ছে। পুরো দক্ষিণ ভারতে এটিই হবে বাংলাদেশের প্রথম দূতাবাস।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই দূতাবাস খোলার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। এর জন্য যে যে বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি দরকার, তার সবই এসে গেছে— এখন শুধু তামিলনাড়ু রাজ্য সরকারের অনুমতি পেলেই বাংলাদেশ সরকার দূতাবাস ভবনের জন্য পছন্দসই বাড়ি খোঁজা শুরু করতে পারে।
এই মুহূর্তে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাই কমিশন ছাড়াও ভারতের আরও দুই মেট্রো শহর কলকাতা ও মুম্বাইতে তাদের ডেপুটি হাই কমিশন রয়েছে। এছাড়া, ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা ও আসামের রাজধানী গৌহাটিতেও রয়েছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন। চেষ্টা চলছে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতেও একটি মিশন খোলার।
এই মানচিত্র থেকে ভারতের দাক্ষিণাত্য এতদিন পুরোপুরি বাইরেই থেকে গেছে– অথচ দক্ষিণ ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক যে আরও নিবিড় করা দরকার, সেই প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরেই। চেন্নাইয়ে বাংলাদেশের মিশন চালু হলে সেই অভাব অনেকটাই মিটতে পারে।
চেন্নাইতে একটি বিদেশি রাষ্ট্রের দূতাবাস খোলার ঝক্কি অবশ্য কম নয়। যেহেতু ওই রাজ্যে শ্রীলঙ্কা থেকে তামিল শরণার্থীদের আসার ও এলটিটিই’র সঙ্গে তাদের যোগসাজশের দীর্ঘ ইতিহাস আছে, তাই সেখানে দূতাবাস খোলার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজি হওয়াটাই যথেষ্ঠ নয়। এর সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (গোয়েন্দা বিভাগ) সম্মতিও জরুরি, তার সঙ্গে সবুজ সংকেত লাগবে তামিলনাড়ু রাজ্য সরকারেরও।
বাংলাদেশ সেই ধাপগুলো ধীরে ধীরে পেরিয়ে দূতাবাসের ছাড়পত্র প্রায় জোগাড় করে ফেলেছে। এখন শুধু বাকি রাজ্য সরকারের অনুমোদন পাওয়া, যেটা নেহাতই সময়ের অপেক্ষা বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী সম্প্রতি একটি বিনিয়োগ সম্মেলনে যোগ দিতে তামিলনাডু লাগোয়া পন্ডিচেরি (এখন যার নাম ‘পুদুচ্চেরি’) শহরে গিয়েছিলেন। তখনও এই বিষয়টি নিয়ে তামিলনাড়ু সরকারের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
কিন্তু চেন্নাইতে মিশন চালু হলে বাংলাদেশের তাতে কী লাভ হবে?
জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘লাভ দুদিক থেকেই। চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষাসহ নানা কাজে লাখ লাখ বাংলাদেশি যেমন প্রতিবছর দক্ষিণ ভারতে যান, তেমনি দক্ষিণ ভারত থেকেও প্রচুর ভারতীয় নাগরিক (মূলত তথ্যপ্রযুক্তি খাতে) ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করতে যান। তাদের সবার জন্যই ভীষণ কাজে আসবে এই মিশন।’
বিশেষত যে বাংলাদেশিরা ভারতে চিকিৎসার প্রয়োজনে আসেন, তাদের অনেকেরই গন্তব্য হলো চেন্নাই, ভেলোরসহ দক্ষিণের বিভিন্ন শহরের মেডিক্যাল কলেজ বা বেসরকারি হাসপাতালগুলো। চেন্নাইতে তাদের দেশের একটি নিজস্ব মিশন থাকলে যথারীতি তারা যেকোনও ধরনের বিপদে-আপদে অনেক বেশি আশ্বস্ত বোধ করবেন।
চেন্নাই-হায়দ্রাবাদ-ব্যাঙ্গালোরের যে বিশাল ‘আইটি ওয়ার্কফোর্স’ ইদানিং বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থার জন্য কাজ করতে যাচ্ছেন, তাদের ভিসা-ওয়ার্ক পারমিট বানানো বা তার মেয়াদ বাড়ানোর জন্যও তখন আর দিল্লি-মুম্বাই পাড়ি দেওয়ার দরকার হবে না, ঘরের কাছে চেন্নাইতেই সে কাজ সারা যাবে।
তবে চেন্নাইতে বাংলাদেশের দূতাবাস খোলার প্রধান লক্ষ্য অবশ্যই অর্থনৈতিক। চেন্নাই এখন ভারতের সবচেয়ে বড় ‘অটোমোবিল হাব’-ই শুধু নয়, ভারতের যেসব এলাকায় শিল্পায়নের গতি সবচেয়ে দ্রুত— চেন্নাই তার অন্যতম। চেন্নাই-সালেম এক্সপ্রেসওয়ে’কে ঘিরে পরিকল্পনা করা হয়েছে ভারতের সব চেয়ে বড় অর্থনৈতিক করিডরেরও। দক্ষিণ ভারত এখন এদেশে শিল্প ও উৎপাদনের প্রধানতম কেন্দ্র, চেন্নাইকে তার ‘সেন্টার অব গ্র্যাভিটি’ বললেও ভুল হবে না।
ফলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে শিল্প সহযোগিতার দিগন্ত যখন নতুন নতুন খাতে প্রসারিত হচ্ছে এবং দুদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনারও জোরালো প্রচেষ্টা চলছে, এমন পটভূমিতে চেন্নাইয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত নতুন দূতাবাস দারুণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে।








