পুলিশ ও জনপ্রশাসনের যে ৯২ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিষয়ে কিছুই ভাবছে না সরকার। এসব কর্মকর্তার বিষয়ে এই মুহূর্তে সরকারের কিছুই করার নেই বলেও জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী নির্বাচন কমিশনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের সম্মতি ছাড়া কাউকে কোথাও বদলি বা পদায়ন করা হচ্ছে না। কাজেই এই মুহূর্তে এসব কর্মকর্তার বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, অভিযোগ দাখিল করলেই হবে না। ব্যবস্থা বা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তো অভিযোগের ভিত্তি দেখতে হবে। সরকারের নির্দেশ মান্য করা একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য প্রধান ও একমাত্র কর্তব্য। কারণ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাকে সরকারের আদেশ মানতেই হবে। সরকারের আদেশ ঠিকভাবে মান্য করা তো আর অন্যায় নয়। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা যদি সরকারের আদেশ না মানেন, তাহলে তা হবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা। বিষয়গুলো গভীরভাবে ভাবতে হবে।
এদিকে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারের আদেশ নির্দেশই মানবেন। এটিই তো তাদের দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা যদি অন্যায় হয়, তাহলে তার আগে ঠিক করতে হবে, এ সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার নির্দেশ মানবেন। তিনি বলেন, এভাবে প্রকাশ্যে লিখিত অভিযোগ করে সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের হেয় করা হয়েছে। ছোট করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, যারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, তাদের বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হয়। এভাবে যদি কোনও ভিত্তি ছাড়া গায়ে দলীয় তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে অন্য সরকারের সঙ্গে কর্মকর্তার ও কর্মকর্তার সঙ্গে সরকারের একসঙ্গে কাজ করা বিব্রতকর হবে।’
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের অভিযোগ সংক্রান্ত কোনও চিঠি আমলে নেওয়া হবে না। রাজনৈতিক দলের চিঠি আমলের নেওয়ার পরিবর্তে প্রার্থীর অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়গুলো কমিশন বেশি গুরুত্ব দেবে।’ রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে প্রার্থীর অভিযোগ আমলে নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, বিএনপির পক্ষ থেকে গত ২২ নভেম্বর এসব কর্মকর্তাকে বিতর্কিত উল্লেখ করে তাদের প্রত্যাহারসহ নির্বাচনি সব ধরনের দায়িত্ব থেকে বিরত রাখারও দাবি জানিয়েছে দলটি। এই তালিকায় রয়েছেন পুলিশের ডিআইজি, এডিশনাল আইজি, অতিরিক্ত কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তা, এসপি ও ডিসি। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন সচিবের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে বিএনপির আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রোপাগান্ডা। আমাকে বিতর্কিত, হেয় প্রতিপন্ন ও এক ধরনের চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এ কাজটি করছে বিএনপি।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহম্মদ শফিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়ছেন, ‘এক্ষেত্রে আমাদের তো কিছু করার নেই। এই নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কিছুই ভাবছে না।’
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘একক কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেই। এখন কিছু করতে হলে তার জন্য নির্বাচন কমিশনের সম্মতি লাগবে। আমরা নির্বাচন কমিশন থেকে এখনও কোনও নির্দেশনা পাইনি। তাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কিছু করার নেই।’
উল্লেখ্য, বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট ৭০ জন পুলিশ কর্মকর্তার প্রত্যাহার চেয়েছে। এই ৭০ জন হলেন—অ্যাডিশনাল আইজিপি (প্রশাসন) মোখলেছুর রহমান, র্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, অ্যাডিশনাল আইজি (টেলিকম) ইকবাল বাহার, ডিআইজি (নৌ-পুলিশ) শেখ মো. মারুফ হাসান, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. কামরুল আহসান, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. দিদার আহমেদ, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি এম খুরশিদ হোসেন, কমিশনার (ডিআইজি কেএমপি) হুমায়ুন কবির, ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, কমিশনার (ডিআইজি) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ মাহবুবুর রহমান রিপন, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি, ঢাকা) মীর রেজাউল আলম, ডিআইজি (সিটি এসবি ঢাকা) মোহাম্মদ আলী মিয়া, ডিআইজি (রংপুর রেঞ্জ) দেবদাস ভট্টাচার্য, অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি ডিএমপি) কৃঞ্চপদ রায়, ডিআইজি (পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স) হাবিবুর রহমান, ডিআইজি (অপারেশন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স) আনোয়ার হোসেন, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাফিস আক্তার, ডিআইজি (ট্রেনিং) ড. খ. মহিদ উদ্দিন, অতিরিক্ত কমিশনার (ডিএমপি) আবদুল বাতেন, র্যাব ৪-এর অ্যাডিশনাল ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির, যুগ্ম কমিশনার (ডিএমপি) শেখ নাজমুল আলম, অ্যাডিশনাল ডিআইজি (খুলনা রেঞ্জ) একেএম নাহিদুল ইসলাম, অ্যাডিশনাল ডিআইজি (খুলনা রেঞ্জ) মো. মনিরুজ্জামান, অ্যাডিশনাল ডিআইজি (সিলেট রেঞ্জ) জয়দেব কুমার ভদ্র, অ্যাডিশনাল ডিআইজি (ঢাকা রেঞ্জ) মো. আসাদুজ্জামান, জয়েন কমিশনার (ডিবি) মাহবুব আলম, এসপি মোল্লা নজরুল ইসলাম, এসপি (টুরিস্ট পুলিশ, সিলেট) আলতাফ হোসেন, ডিসি (তেজগাঁও) বিপ্লব কুমার সরকার, ডিসি ডিএমপি হারুন অর রশীদ, ডিসি রমনা মো. মারুফ হোসেন সরকার, ডিসি (সিএমপি) এস এম মেহেদী হাসান, ডিসি (ডিবি, উত্তর) খন্দকার নুরুন নবী, ডিসি (সিএমপি) মো. ফারুকুল হক, ডিসি (কাউন্টার টেররিজম, ডিএমপি) প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, ডিসি (ডিএমপি) এস এম মুরাদ আলী, এডিসি (ডিএমপি) শিবলী নোমান, এসপি (ঢাকা) শাহ মিজান শফি, এসপি (নায়ারণগঞ্জ) মো. আনিসুর রহমান, এসপি (মুন্সীগঞ্জ) মো. জায়েদুল আলম, এসপি (নরসিংদী) মিরাজ, এসপি (টাঙ্গাইল) সনজিত কুমার রায়, এসপি (মাদারীপুর) সুব্রত কুমার হালদার, এসপি (ময়মনসিংহ) শাহ আবিদ হোসেন, এসপি (শেরপুর) আশরাফুল আজিম, এসপি (সিলেট) মো. মনিরুজ্জামান, এসপি (বরিশাল) সাইফুল ইসলাম, এসপি (ভোলা) মোক্তার হোসেন, এসপি (খুলনা) এস এম শফিউল্লাহ, এসপি (সাতক্ষীরা) মো. সাজ্জাদুর রহমান, এসপি (বাগেরহাট) পঙ্কজ চন্দ্র রায়, এসপি (যশোর) মঈনুল হক, এসপি (ঝিনাইদহ) হাসানুজ্জামান, এসপি (কুষ্টিয়া) আরাফাত তানভির, এসপি (চট্টগ্রাম) নূর এ আলম মিনা, এসপি (নোয়াখালী) ইলিয়াস শরীফ, এসপি (ফেনী) এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার, এসপি (কুমিল্লা) সৈয়দ নুরুল ইসলাম, এসপি (রংপুর) মিজানুর রহমান, এসপি (দিনাজপুর) সৈয়দ আবু সায়েম, এসপি (ঠাকুরগাঁও) মনিরুজ্জামান, এসপি (রাজশাহী) মো. শহিদুল্লাহ, এসপি (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) মোজাহিদুল ইসলাম, এসপি (নওগাঁ) ইকবাল হোসেন, এসপি (নাটোর) সাইফুল্লাহ, এসপি (বগুড়া) আশরাফ আলী, এসপি (সিরাজগঞ্জ) টুটুল চক্রবর্তী ও এসপি (পাবনা) রফিক ইসলাম।
পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২২ কর্মকর্তার বদলিও চেয়েছে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই ২২ কার্মকর্তা হলেন—জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান, খুলনার বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া, ভোলার ডিসি মো. মাসুদ আলম সিদ্দিকী, চট্টগ্রামের ডিসি মো. ইলিয়াস হোসাইন, কুমিল্লার ডিসি মো. আবুল ফজল মীর, ফেনীর ডিসি ওয়াহেদুজ্জামান, লক্ষ্মীপুরের ডিসি অঞ্জন চন্দ্র পাল, কিশোরগঞ্জের ডিসি সারোয়ার মোর্শেদ চৌধুরী, নরসিংদীর ডিসি সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন ও টাঙ্গাইলের ডিসি মো. শহিদুল ইসলাম।
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল অনুযায়ী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২৮ নভেম্বর, মনোনয়নপত্র বাছাই ২ ডিসেম্বর ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ৯ ডিসেম্বর।








