সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে কোনও প্রার্থী যেন নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ না করেন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। আচরণবিধি ভঙ্গ করলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী সতর্ক হয়ে যাবে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন যেহেতু নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত একটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছে, ফলে তাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে। গণমাধ্যমে কথা বলার ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার।
দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) বিকাল সাড়ে ৪টায় অনুষ্ঠিত ‘নির্বাচনি আচরণবিধি’ শীর্ষক বৈঠকিতে বক্তারা এমন অভিমত দেন।
রাজধানীর শুক্রাবাদে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ আয়োজন সরাসরি সম্প্রচার করে এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখানো হয় বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি।
সাংবাদিক মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বৈঠকিতে অংশ নেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স—ফেমা’র প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান, সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক কাজী মারুফুল ইসলাম, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত এবং বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম।
বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শেরপুরে একটি আসনের প্রার্থী, তিনি জাতীয় সংসদের একজন হুইপ। তিনি তার হাজার হাজার মোটরসাইকেল ও শত শত মাইক্রোবাসের বহর নিয়ে তার এলাকায় যাচ্ছিলেন। তার দলের লোকজন তাকে সংবর্ধনা দিচ্ছিলেন। এই বহরে থাকা মাইক্রোবাসের চাপে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। এটি নির্বাচন আচরণ বিধি লঙ্ঘনের কোন পর্যায়ে পড়ে? ইশতেহার ঘোষণার অনেক আগে থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিজ নিজ এলাকা থেকে তাদের পোস্টার সরিয়ে ফেলার জন্য নির্বাচন কমিশন নির্দেশনা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনও প্রার্থী তার পোস্টার-তোরণ সরিয়ে নিয়েছে বলে আমার জানা নেই। এটি আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোন পর্যায়ে পড়ে? ঢাকা থেকে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর এলাকা পর্যন্ত পোস্টারে ছেয়ে গেছে। নির্বাচনি আচরণ তাহলে আচরণবিধি কীভাবে মেনে চলা হলো? নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্বকথা হলো সবাইকে সমান সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু যিনি ক্ষমতাবান একমাত্র তিনিই এটার সুষ্ঠু ব্যবহার করেন। এখানে নির্বাচনি আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন নয়, কিন্তু নির্বাচন কমিশন এসব আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য কি ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটা জানার খুব ইচ্ছা।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন বাংলাদেশের একটি উৎসব। গত সবগুলো নির্বাচনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, নির্বাচন কমিশনের অনেক উন্নতি হয়েছে। সেই সঙ্গে কমিশনকে আরও সতর্ক হতে হবে।’
ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত বলেন, ‘সেনা মোতায়েনকালীন নির্বাচন দেখেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালীন নির্বাচন দেখেছি, বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের আওতায় নির্বাচন দেখছি। এই মুহূর্তে খুব একটা হতাশার জায়গা কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না। নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে খুব একটা পার্থক্য চোখে পড়ছে না।’
তিনি বলেন,‘বর্তমানে নির্বাচনি আচরণবিধি কিন্তু আগের তুলনায় মানার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছি। আগে তো ক্ষমতাবান প্রার্থীরা বিশাল বিশাল পোস্টার ব্যবহার করতেন ক্ষমতার দাপটে। কিন্তু এখন নির্দিষ্ট সাইজ নির্ধারণ করার কারণে তা মানা হচ্ছে। যদিও তোরণ তৈরি এখনও সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া কিছু বক্তব্য শোনা যাচ্ছে যা নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে— এই কথাটি ইলেকশন কমিশনের মুখ দিয়ে আশা করা যায় না। হয়তো তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ইতিবাচক দিক থেকে, কিন্তু তিনি শব্দচয়নটি এমনভাবে করেছেন তাতে তা নেতিবাচক মনে হয়েছে, সমালোচনা হয়েছে। ফলে নির্বাচন কমিশনকে আরও সতর্ক হতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনি আচরণ ভাঙাটা আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ দিতে পারি। সর্বশেষ নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়ের কিছু উদাহরণ। শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামার পরই দেখা গেলো সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্নজন প্রতিনিয়ত আইন ভাঙছেন। এখন কথা হলো যারা প্রতিদিন আইন ভাঙছেন তারা কীভাবে নির্বাচনের আচরণবিধি মেনে চলবেন?’
নির্বাচনের এই পর্যবেক্ষক বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই মূলত নির্বাচনি আচরণবিধি কার্যকর হয়। কিন্তু একের পর এক প্রার্থীরা তাদের আচরণবিধি ভাঙছেন। কিন্তু কমিশন কিছুই বলছে না। ফলে কমিশনকে আরও কঠোর হতে হবে। কাজ করতে হবে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘কক্সবাজারের আবদুর রহমান বদিকে মনোনয়ন না দিয়ে তার স্ত্রীকে দেওয়া হলো। আবার টাঙ্গাইলের আমানুর রহমান খান রানাকে বাদ দিয়ে তার বাবাকে মনোনয়ন দেওয়া হলো। কোনও না কোনোভাবে সেই গণ্ডির মধ্যেই থাকছে।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণ জনগণের মধ্যে দলীয় জরিপের ওপর ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু হয়তো জনগণ তাদের চেয়েছে। তবে এর আগেও অনেক অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।’
ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স—ফেমার প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান বলেন, ‘পর্যবেক্ষকদের নীতিমালায় অনেক কিছুই বলা হয়েছে। আমরা যারা পর্যবেক্ষক তাদের একটি নীতিমালা দেওয়া হয়েছে। কোনগুলো মেনে চলতে হবে তা বলা হয়েছে সেখানে। আমরা কোনও পক্ষপাতিত্ব দেখাবো না। আমাদের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে কোনও বাধা হওয়া যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেটা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পর্যবেক্ষকদের বলা হয়েছে, সব কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা কেমন প্রতি ঘণ্টায় তার একটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করতে হয়। ভোটারের উপস্থিতির ছবি তুলতে হয়। সব পার্টির পোলিং এজেন্ট আছে কিনা তা উল্লেখ করা। সেখানে রোল নম্বরের মতো নম্বর ডাকতে হয়। কেউ অনুপস্থিত হলে তার কারণ খুঁজতে হয়। আমাদের নথিতে উল্লেখ করতে হয় কেন পোলিং এজেন্ট অনুপস্থিত রয়েছে। আবার এসব তথ্য নিতে গেলে সময়ও অল্প পাওয়া যায়। আবার কতক্ষণ অবস্থান করবো সেটার ব্যাপারেও নির্দেশনা দেওয়া আছে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন নির্বাচনি আচরণবিধি কোনোভাবে লঙ্ঘিত না হয়। একজনকে শাস্তি দিলেই এই লঙ্ঘনের প্রবণতা কমে যাবে।’
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আচরণবিধি মূলত একটি গাইডলাইন। ইলেকশন কমিশন একটি গাইডলাইন ঠিক করে। সেই গাইডলাইন বা বিধি প্রার্থী এবং পলিটিক্যাল পার্টি মেনে চলবে। এটা একটি ‘কোড অব কন্ডাক্ট’। এটি বিধি হওয়ায় এর আইনি কোনও ভিত্তি নেই। কিন্তু এই বিধি ভঙ্গ করলে তার শাস্তির ব্যবস্থা করার সুযোগ রাখা হয়। মূলত সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে এই বিধি তৈরি করা হয়। এই বিধি ভঙ্গ করলে প্রথমে ওয়ার্নিং দেওয়া হয়, এরপর তাকে শোকজ দেওয়া হয়। পরে জরিমানা করা হয়। আর আইন ভঙ্গ করলে শাস্তির ব্যবস্থা যত দ্রুত সম্ভব করার বিধি রয়েছে। এমনকি এই বিধি ভঙ্গ করলে নির্বাচন স্থগিত পর্যন্ত করা যায়।’
সঞ্চলকের এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, “নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে মিডিয়ার সহযোগিতা নেওয়ার কথা বলা হয়। সেটা পরিচালিত হওয়ারও একটি নিয়ম রয়েছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো যেহেতু তাৎক্ষণিক খবর প্রকাশ করে, সুতরাং সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তাদের ইফেক্টিভভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। কোথাও কোনও অনিয়ম হলে তাৎক্ষণিক খবর প্রকাশ করতে পারবে। তাতে কমিশন যেন দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে নির্বাচন কেন্দ্রে গিয়ে মিডিয়া সেখানকার গোপন কক্ষের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করতে পারবে না এবং কোনও ভোটারকে প্রশ্ন করতে পারবে না, ‘আপনি কাকে ভোট দিয়েছেন’— এটাও একটি আচরণবিধি লঙ্ঘন।”
তিনি আরও বলেন, ‘শেরপুরে প্রার্থীকে সংবর্ধনা দিতে গিয়ে মাইক্রোবাসের চাপায় মানুষ মারা যাওয়ার যে ঘটনা ঘটেছে তা আচরণবিধি সর্বোচ্চ লঙ্ঘন করেছেন ওই প্রার্থী। তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কমিশনের উচিত ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ নির্বাচনি আচরণবিধিতে এটা সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে।’








