রেলপথ নিয়ে জেলা প্রশাসকদের প্রস্তাবনার যত অগ্রগতি

জামাল উদ্দিন
২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:১০আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:১৮

রেলপথ নিয়ে জেলা প্রশাসকদের প্রস্তাবনার যত অগ্রগতি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে রেলপথ মন্ত্রণালয় নিয়ে বেশ কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন জেলা প্রশাসকরা। যারমধ্যে স্বল্প মেয়াদি প্রস্তাবনাগুলোর কয়েকটির বাস্তবায়ন হয়েছে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেই। কিছু কাজ এখনও চলমান। দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবনাগুলো নিয়েও পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা।

গত ২৪ থেকে ২৬ জুলাই (২০১৮) সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে জেলা প্রশাসকরা রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত ৩৩৬টি প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন। যারমধ্যে ৮০টি প্রস্তাবনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এগুলোর মধ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত নয়টি প্রস্তাবনা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি হিসেবে চিহ্নিত করে বাস্তবায়নের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রস্তাবনাগুলোর একটি হচ্ছে ‘রেলে নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণের স্বার্থে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করতে হবে।’গত ২ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক পর্যালোচনা সভায় এ প্রস্তাবনার অগ্রগতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘বর্তমানে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ঢাকার মধ্যে চলাচলরত ৩২টি ট্রেনের মধ্যে ২৬টিতে একটি করে বগি নারী ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া, তুরাগ এক্সপ্রেস ১, ২, ৩, ৪ এবং তিতাস কমিউটার ট্রেনে মহিলাদের জন্য একটি করে বগি সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যান্য মেইল ও কমিউটার ট্রেনে বাস্তবতার আলোকে নারীদের জন্য নির্ধারিত আসন সংরক্ষণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।’

আরেকটি প্রস্তাবনা ছিল ‘জামালপুরে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে আসন সংখ্যা বাড়াতে হবে।’এই প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ঢাকা-জামালপুর সেকশনে চলাচলকারী তিস্তা এক্সপ্রেসের একটি নতুন কোচ প্রতিস্থাপন করে আসন সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া বহ্মপুত্র ও যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেন দু’টি ১৮টি কোচের সমন্বয়ে চলাচল করছে। কোচের স্বল্পতা ও ইঞ্জিনের কোডাল লাইফ বেড়ে যাওয়ায় নতুন কোচ ও ইঞ্জিন আমদানির পর এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’

বৃদ্ধ, শিশু ও অসুস্থ যাত্রীদের স্টেশনের ভেতরে যাতায়াতের জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত টয়লেট সুবিধা, ক, খ, গ ইত্যাদি নির্দেশক চিহ্ন দিয়ে প্ল্যাটফর্মের বগির অবস্থান নির্ণয় করা, রুচিসম্মত ও মানসম্মত সময়োপযোগী খাবার পরিবেশন করা এবং প্ল্যাটফর্মে ঝামেলামুক্তভাবে যাত্রীদের লাগেজ পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত ট্রলির ব্যবস্থা রাখার বিষয়ে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে প্রস্তাবনা ছিল। এসব বিষয়ের অগ্রগতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘বৃদ্ধ, শিশু ও অসুস্থ যাত্রীদের স্টেশনের ভেতরে যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোয় হুইল চেয়ার সরবরাহ করা হয়েছে। সড়কের পাশের স্টেশনগুলোয় যাত্রীছাউনি ও প্ল্যাটফর্মের পরিধি বাড়ানোসহ প্রতি স্টেশনে কমপক্ষে দু’টি বিশ্রামাগার স্থাপনের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীসেবার মান উন্নত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দূরপাল্লার ট্রেনগুলোতে ধারাবাহিকভাবে নতুন কোচ প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। বড়  স্টেশনগুলোয় যাত্রীছাউনি ও প্ল্যাটফর্মের পরিধি বাড়ানোসহ মানসম্মত টয়লেট সুবিধা স্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ট্রেনের প্রতিটি বগির উভয় দরজায় ক, খ, গ ইত্যাদি নির্দেশক চিহ্ন দেওয়া আছে। এছাড়া ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে প্ল্যাটফর্মে বগির অবস্থান শনাক্তে চিহ্ন স্থাপন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইতোমধ্যে একটি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বগির অবস্থান নির্দেশক হিসেবে ক, খ, গ ইত্যাদি স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া বড় বড় স্টেশনে ইনফরমেশন বুথ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। রুচিসম্মত, মানসম্মত ও সময়োপযোগী খাবার পরিবেশনের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনে পর্যটন করপোরেশন খাবার সরবরাহ করছে। অন্য ট্রেনগুলোতেও মানসম্মত খাবার সরবরাহ করার জন্য ট্রেন কম্পোজিশনের ফ্রিজ, ওভেন ইত্যাদি ব্যবহার উপযোগী কোচ আমদানি করা হচ্ছে। প্ল্যাটফরমে ঝামেলামুক্তভাবে যাত্রীদের লাগেজ পরিবহনের জন্য বড় বড় স্টেশনে ৫০০টি ট্রলি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন চালু করার একটি প্রস্তাবনা ছিল। সেটি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে টাঙ্গাইল কমিউটার নামে একটি কমিউটার ট্রেন ‘ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু-পূর্ব ঢাকা’ রুটে চলাচলের বিষয়টি অনুমোদিত হয়েছে। গত ১৩ নভেম্বর (২০১৮) থেকে টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেনটি ওই রুটে চলাচল করছে।

প্রস্তাবনার আরেকটি ছিল ‘ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চালু করে চিলমারী পর্যন্ত কানেকটিং ট্রেন চালু করতে হবে।’ এর অগ্রগতি সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘বর্তমানে ঢাকা-রংপুর-ঢাকা ও ঢাকা-লালমনিরহাট-ঢাকা রুটে চারটি আন্তনগর ট্রেন পরিচালিত হচ্ছে। এ চারটি আন্তঃনগর ট্রেন কাউনিয়া স্টেশনে বিরতি থাকায় কুড়িগ্রাম জেলার যাত্রী সাধারণ সরাসরি ঢাকা-কুড়িগ্রাম-ঢাকা রুটে আন্তঃনগর ট্রেনের মাধ্যমে যাতায়াতের সুবিধা ভোগ করছে। বর্তমানে রেলওয়েতে লোকোমোটিভ (ট্রেনের ইঞ্জিন) ও জনবল স্বল্পতা রয়েছে। ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ পাওয়া গেলে এবং জনবল ঘাটতি পূরণ সম্ভব হলে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চালু করে কানেক্টিং সাটল ট্রেনের মাধ্যমে চিলমারী পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

জেলা প্রশাসকদের প্রস্তাবনায় ছিল ‘ময়মনসিংহ শহরের মধ্য দিয়ে চলমান রেললাইনটি মূল শহরের মাঝখান থেকে দক্ষিণাংশে বাইপাস সড়কের সমান্তরালে স্থাপন করা এবং রেললাইনের জায়গায় একটি প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ করা।’ এই প্রস্তাবনার অগ্রগতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ময়মনসিংহ জংশন রেলওয়ে স্টেশনটি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রেলযোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। এই স্টেশনটি একটি আন্তনগর ও ৩০টি মেইল, এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেনের উৎপত্তিস্থল ও গন্তব্যস্থল। ভবিষ্যতেও এই স্টেশন ট্রেন যোগাযোগের হাব হিসেবে উন্নীত হবে। এছাড়া ময়মনসিংহ জংশন থেকে ১৪টি (সাত জোড়া) আন্তঃনগর ট্রেন বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। এ কারণে ট্রেন চলাচলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা তথা লোকোসেড, ক্যারেজ ডিপো, বৈদ্যুতিক স্থাপনা, স্টেশন ভবন, স্টেশন ইয়ার্ড ওয়াশ পিট ইত্যাদি বিদ্যমান। শহরের মধ্যে অবস্থিত রেল লাইনটি মূল শহরের দক্ষিণাংশে বাইপাস সড়কের সমান্তরালে স্থানান্তর করতে হলে উক্ত স্থাপনাগুলো নতুন জায়গায় স্থানান্তর করতে হবে। এতে নতুন এলাইনমেন্টে রেল লাইন ও সেতু নির্মাণসহ বিপুল পরিমাণে জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। বিষয়টি কারিগরিভাবে বাস্তবসম্মত নয় এবং অর্থনৈতিক ও আর্থিকভাবে ফলপ্রসূ হবে না বলেও প্রতীয়মান হয়। বর্তমানে জয়দেবপুর-জামালপুর সেকশনে বিদ্যমান রেললাইনের সমান্তরাল নতুন ডুলেগেজ লাইন নির্মানের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রাথমিক পর্যালোচনাতেও এই প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য (ভাইয়েবল) নয় বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় শহরের বিভিন্ন লেভেল ক্রসিংয়ে  ওভারপাস নির্মাণ করে যানজট নিরসনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।’

নেত্রকোনা জেলার জারিয়া থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার রেললাইন সম্প্রসারণের প্রস্তাবনার অগ্রগতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, জারিয়া থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের কোনও পরিকল্পনা আপাতত নেই। ভবিষ্যতে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পাদনের মাধ্যমে কারিগরি, আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগতভাবে বাস্তবায়নযোগ্য বিবেচিত হলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণের প্রস্তাবনার অগ্রগতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সমীক্ষা প্রস্তাব প্রণয়ন চলমান আছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পাদনের মাধ্যমে কারিগরি, আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগতভাবে বাস্তবায়নযোগ্য বিবেচিত হলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সিরাজগঞ্জ-বগুড়া ও রংপুর রেলপথ সংযোগ প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করার প্রস্তাবের অগ্রগতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, বগুড়া থেকে রংপুর পর্যন্ত রেলপথ না থাকায় বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত সরাসরি রেলপথ নির্মাণের লক্ষ্যে তৃতীয় ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ৯৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘বগুড়া থেকে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ’শীর্ষক প্রকল্প গত ৩০ অক্টোবর (২০১৮) একনেক সভায় অনুমোদিত হয়েছে।’ দ্রুত প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শুরু করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

/এমএনএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম