জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নতুন নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে কর্মসূচি দেবে। এরই মধ্যে বিএনপি, বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং ধর্মভিত্তিক দলগুলো এ ব্যাপারে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ঐক্যফ্রন্টসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তবে এ নির্বাচনে রবিবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই তারা অভিযোগ করে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়নি। ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে তারা নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
রবিবার সন্ধ্যায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা প্রাথমিক আলোচনা করেন ড. কামাল হোসেনের বাসায় বসে। এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ফ্রন্টের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা সোমবারের মধ্যে ঢাকায় পৌঁছানোর পরপরই ফ্রন্টের বৈঠক হবে। সোমবার ১২টায় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত জানাতে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম প্রধান শরিক বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দুটি রাজনৈতিক সাফল্য এসেছে। যদিও সাংগঠনিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার দুশ্চিন্তা তারা মাথায় রেখেছেন। নেতারা মনে করছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় যে সমালোচনা ছিল, তা এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না, এরচেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে? দলীয় সরকার মানেই দলীয় প্রশাসন। দেশবাসী, পৃথিবীর লোকজন দেখেছে, বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। এবার সেটি আরও পরিষ্কারভাবে ধরা পড়লো।’
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির একাধিক নেতা জানান, নির্বাচনের পুরো ফল প্রকাশ হওয়ার পর দল ও ফ্রন্টের বিভিন্ন স্তরে আলোচনা হবে। এরই মধ্যে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানানো হলেও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা নির্ধারণ করতে অন্তত এক থেকে দুই দিন সময় লাগবে। দল ও জোটের সিনিয়র নেতাদের প্রায় অনেকেই ঢাকার বাইরে। পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে তারা ঢাকায় আসবেন।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, সোমবার বিকাল ৪টায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক এবং সন্ধ্যা ৬টায় ২০ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘এখনও নির্বাচনের পুরো ফল আসেনি। পুরোটা আসুক। এরপর দল ও জোটে এবং ফ্রন্টে আলোচনা হবে। এরপর ঠিক হবে পরবর্তী কৌশল।’
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির একজন সদস্য জানান, রবিবার প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনের ফল, পুরো বিষয়টি কোন কোন কৌশলে উপস্থাপন হবে। এর মধ্যে আইনি দিকটি দেখভালের জন্য কামাল হোসেনসহ ফ্রন্টের একজনকে বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, পুরো রেজাল্ট, কেন্দ্রের ভিডিও ফুটেজ, বিদেশিদের সামনে উপস্থাপন, বিদেশি কূটনীতিকদের অবহিত করার পরই দলের কয়েক স্তরের বৈঠক করা হবে। এসব বৈঠক থেকে পরামর্শ গ্রহণের পরই কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল জানান, পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে কর্মসূচির মধ্যে হরতাল, নির্বাচন কমিশন অভিমুখে পদযাত্রাসহ কিছু কর্মসূচি থাকবে। এই কর্মসূচিগুলো নির্বাচন বয়কটকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় করার চেষ্টা করা হবে।
রবিবার নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় ড. কামাল হোসেন জানিয়ে রেখেছেন, ‘একটি নতুন নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে এবং সেটা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। এই নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হয়েছে। সবখানে জালিয়াতির মাধ্যমে ভোট হয়েছে। আন্দোলনের অংশ হিসেবেই ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যোগ দিয়েছিল এবং এই আন্দোলনও চলবে।’
এদিকে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বাইরে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও ইসলামী আন্দোলনও নতুন নির্বাচনের দাবিতে কর্মসূচি দেওয়ার কথা জানিয়েছে। দলগুলোর নেতারা বলছেন, বর্তমান ইসির পদত্যাগ করে নতুন কমিশনের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। বিশেষ করে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না— এ দাবিটিকেই সামনে আনা হবে।
বাম গণতান্ত্রিক জোটের সাবেক সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি। আগামীকাল সোমবার দলীয়ভাবে এবং মঙ্গলবার জোটের বৈঠকে আলোচনা করে নতুন কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে। এই নির্বাচন বাতিল, সরকারের পদত্যাগ ও নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতেই কর্মসূচি আসবে।’ তিনি বলেন, ‘মানুষের নির্বাচন করার, মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে দায়দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করতে হবে ইসিকে। জোরালোভাবে আমরা জনগণকে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের আহ্বান জানাবো।’
ইসলামী আন্দোলনের প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে নির্বাচন হয়েছে এটাকে নির্বাচন বলে না। অভিযোগ কাকে জানাবো, সবাই তো দলীয়, একজোট। এখন প্রতিবাদ করতে হবে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামতে হবে। কর্মসূচি থাকবে। দলের নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সব নির্ধারণ করা হবে।’
২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের বলেন, ‘কাল-পরশুর মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাবে আমাদের নতুন কর্মকৌশল।’








