যৌন হয়রানি, নাকি যৌন হয়রানি না!

উদিসা ইসলাম
০৮ মার্চ ২০১৯, ১২:১০আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৯, ১৫:২২



যৌন হয়রানি (ছবি প্রতীকী) সাবরিনা হক রাস্তায় দাঁড়িয়ে যানবাহনের অপেক্ষা করছিলেন। এমন সময় এক অপরিচিত লোক তার দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে। বিষয়টি লক্ষ্য করে সাবরিনা একটু সরে আসেন। সেই লোকও তাকে অনুসরণ করে। একসময় পাশের অপরিচিত লোক আরও কাছে চলে আসে। এবার সাবরিনা তাকে জিজ্ঞেস করে, কী দেখেন? লোকটি প্রথমে অস্বীকার করে এবং বলেন, এমনিই কিছু দেখি না। জানান, নিজের কাজে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তবে সাবরিনা প্রতিবাদ জানালে লোকটির উত্তর: দেখতে খারাপ হয়েও এত অহংকার ভালো না, বলে সে চলে যেতে শুরু করে। এবার সাবরিনা ওই লোকটির পথ আটকান ও আশপাশের লোকদের ডাকেন। সাবরিনা তাদের কাছে অভিযোগ করেন, লোকটি আমার দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, আমাকে আবার দেখতে খারাপ বলেও মন্তব্য করেছে, আমাকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগে আমি তাকে পুলিশে দিতে চাই। আপনারা সহায়তা করুন।

তবে উপস্থিত মানুষজন সাবরিনাকে সহায়তা না করে উল্টো বলে: ‘যৌন হয়রানি করলো কখন’, ‘উনি তো তাকিয়ে দেখেছেন মাত্র’, ‘গায়ে তো হাত দেয়নি। তাহলে যৌন হয়রানি হলো কীভাবে’, ‘বাদ দেন’, ‘ভালো মেয়েরা রাস্তায় চিল্লাচিল্লি করে না’। এরপরও ঘটনাস্থলের পাশে দাঁড়ানো টহল পুলিশের সদস্যদের কাছে বিষয়টিতে সাহায্য চাইতে যান সাবরিনা। তবে তারাও দ্বিধান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘এত মানুষজনের সামনে যৌন হয়রানি হল কখন?’

যৌন হয়রানি নিয়ে আমাদের সমাজে এমন দৃশ্য হরহামেশাই দেখা যায়। কারণ  যৌন হয়রানির সংজ্ঞা আমরা জানি না এবং কোন বিষয় ও আচরণকে আমরা যৌন হয়রানি বলবো সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই। আর এ কারণেই নারীরা এমন আচরণের শিকার হচ্ছেন। আর বিষয়টিতে সমাজ এবং আইন তেমন প্রতিরোধও সৃষ্টি করতে পারছে না।

২০০৯ সালে যৌন হয়রানি রোধে কয়েকটি দিকনির্দেশনা দিয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে দেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ওই রায় ঘোষণা করেন।

তাতে বলা হয়, যতদিন জাতীয় সংসদে যৌন হয়রানি রোধে কোনও আইন প্রণয়ন করা না হয়, ততদিন বাংলাদেশ সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টের দেওয়া এ নীতিমালা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হবে। সেখানে যৌন হয়রানি কোনটাকে বলবে তার ব্যাখ্যাও দেওয়া আছে। সংজ্ঞায় বলা হয়- ই-মেইল, ক্ষুদেবার্তা (এসএমএস), পর্নোগ্রাফি, টেলিফোনে বিড়ম্বনা, যেকোনও ধরনের চিত্র, অশালীন উক্তিসহ কাউকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সুন্দরী বলাও যৌন হয়রানি।

আর যেহেতু শুধু কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে না, তাই রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে যেকোনও ধরনের অশালীন উক্তি, কটূক্তি করা কিংবা কারো দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকানো ইত্যাদি যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য হবে। এই রায় অনুযায়ী, কোনও নারীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, যেকোনও ধরনের চাপ প্রয়োগ করা, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সম্পর্ক স্থাপন করা, দেয়াল লিখন, অশালীন চিত্র ও আপত্তিকর কোনও ধরনের কিছু করা যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে।

তবে এ বিষয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য এবং সমাজের মানুষের মধ্যে পরিষ্কার ধারণা নেই। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, ‘যৌন হয়রানি নিয়ে হাইকোর্টের যে রায়, সেটা দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল। অথচ এর পরের বাস্তবায়নের যে কাজটি রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানের করার কথা ছিল সেটি সম্ভব হলো না। পুলিশকে প্রতিনিয়ত সংবেদনশীল শব্দগুলো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’

বিশেষজ্ঞরা যখন প্রাতিষ্ঠানিক সক্রিয়তা নিয়ে বলছেন সেসময় একশন এইড এর গবেষণা বলছে, কর্মক্ষেত্রে মানবাধিকার নিয়ে কর্মরত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দুই-একটি ছাড়া সকলেরই ২০০৯ সালের গাইডলাইনের বাস্তবায়ন নেই। এর কারণ সম্পর্কে তাদের পর্যবেক্ষণ, এই গাইড লাইন বিষয়ে তারা জানেনই না।

সংবেদনশীল পুলিশ বাহিনী তৈরির জন্য রিফর্ম প্রোগ্রামে জেন্ডার পড়িয়েছেন নারীনেত্রী ফৌজিয়া খন্দকার।

তিনি বাংলা টিবিউনকে বলেন, ‘প্রথম কাজ ছিল যৌন হয়রানিমূলক শব্দগুলো চেনানো। আমরা শব্দগুলোকে ধরে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। এর অংশ হিসেবে সবকয়টি থানায় সেগুলোর কপি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ দিয়ে আসলে কতটা কী করা গেছে আমি সন্দিহান। কারণ, হাইকোর্টের যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞায় যে বিষয়গুলো উল্লেখ আছে সেগুলোকে মোটেও যৌন হয়রানিমূলক বিষয় হিসেবে মনে করেন না তারা। আপনি প্রশিক্ষণ দিয়ে বিষয়টি শিখিয়ে ঠিক কতদূর নিয়ে যেতে পারবেন?’

সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) নাজমুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও শব্দে যৌন হয়রানির বিষয়টি আপেক্ষিক, যিনি রিসিভ করছেন তার কাছে অস্বস্তিকর কিনা সেটাই বিবেচনার। একই শব্দ একজনের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও আরেকজনের কাছে আপত্তিকর। সেইটা বিবেচনা করে যৌন হয়রানির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। সাইবার জগতে যা প্রকাশিত হয় তাতে কেউ যদি অস্বস্তি বোধ করেন, তবে সেটি যৌন হয়রানি।’

এটি পুলিশের সকলে জানে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সদস্যরা অনলাইন ব্যবহার করেন ব্যক্তিগত পরিসরে। কোনগুলো যৌনহয়রানির মধ্যে পড়বে এ নিয়ে নানা সময় জানানো হয়।’

/ইউআই/টিটি/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম