বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীকে চাপা দেওয়া সুপ্রভাত পরিবহনের বাসটির মালিক গোপাল চন্দ্র কর্মকার। পরিবহন ব্যবসার পাশাপাশি তিনি পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কোম্পানিটিতে তার মালিকানাধীন ৭০টি বাস রয়েছে। আর সুপ্রভাত কোম্পানিতে ৭০টি বাসের রুট পারমিট থাকলেও এই নামে রাস্তায় চলেছে ৪৫০টি বাস। আর এসবই হয়েছে একজন পরিবহন নেতার প্রভাবে। তিনি সদরঘাট-গাজীপুর রুট মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম। আশরাফুল এই পরিবহনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, রাজধানীর সদরঘাট থেকে উত্তরা রানীগঞ্জ পর্যন্ত সুপ্রভাত পরিবহনের চলাচলের অনুমতি ছিল। কিন্তু পরিবহনটি তার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের গাজীপুরা পর্যন্ত চলাচল করতো। এ রুটে কোম্পানির বাসের অনুমতি রয়েছে ৭০টির। কিন্তু বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ৪৫০টির বেশি বাস চালানো হতো সুপ্রভাত নামে। অভিযোগ উঠেছে, সদরঘাট-গাজীপুর রুট মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলামের প্রভাবের কারণে সড়কে বেপরোয়া পরিবহনটির বিরুদ্ধে কেউ কোনও কথা বলতে পারতো না।
সুপ্রভাত পরিবহনের ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা বিলাল উদ্দিন দাবি করেন, ‘আমাদের ১৮০টি গাড়ির অনুমোদন রয়েছে। এতে ১০০ জনের মতো মালিকের গাড়ি আছে। মালিকদের অনেকেই দেশের বাইরে থাকেন। এরইমধ্যে মালিকরা বিআরটিএ’র কাছে গাড়িগুলোর কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। কিন্তু বিআরটিএ এখনও তাদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেনি। আর যে বাসটি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে সেটি গোপাল নামে একজনের। তারও অনেকগুলো গাড়ি রয়েছে। তবে কয়টা গাড়ি আছে সেটা আমার সঠিক জানা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশরাফুল সাহেব এই গাড়ির দেখাশোনা করতেন। শেষ মুহূর্তে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন বলে শুনেছি। নতুন করে কে দায়িত্ব নিয়েছেন তা আমার জানা নেই।’
জানা গেছে, ২০০০ সালের দিকে ১০ নম্বর রুটের ‘সদরঘাট টু রামপুরা’ পরিবহনটির শতাধিক নতুন গাড়ি নিয়ে সুপ্রভাত সার্ভিস নামে যাত্রা শুরু করে। দুই বছর আগে এই সার্ভিসটির সঙ্গে ‘স্পেশাল’ শব্দটি যুক্ত করে ‘সুপ্রভাত স্পেশাল সার্ভিস’ নামে পরিচালিত হচ্ছে। সিটিং সার্ভিস বলে এর ভাড়াও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সদরঘাট থেকে উত্তরার রানীগঞ্জ পর্যন্ত এর রুট পারমিট দেওয়া হয়। তখন বাসের অনুমতি ছিল ৭০টির। কিন্তু একই নম্বর একাধিক গাড়িতে ব্যবহার করে সাড়ে চারশ’র মতো গাড়ি রাস্তায় বের হয়। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কেউ পরিবহনটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবহনটির শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা জানান, সুপ্রভাত পরিবহনে পুরান ঢাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোপাল কর্মকারের ৭০টির মতো বাস রয়েছে। এছাড়া সদরঘাট-গাজীপুর রুট মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম এই পরিবহনের দায়িত্বে রয়েছেন। তার প্রভাবে পরিবহনটি সড়কে দাপিয়ে বেড়াতো। তার প্রভাবের কারণেই পরিবহনের অন্যান্য সমিতিগুলোও সুপ্রভাতের পারমিট নিয়ে কোনও ঝামেলা করতো না। আর রুট পারমিটের শর্ত অনুযায়ী নিজস্ব টার্মিনালে বাস পার্কিংয়ের কথা থাকলেও বাস রাখা হতো সড়কেই।
জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সুপ্রভাত পরিবহনের মালিকদের ডেকে বলে দিয়েছি তাদের কোনও গাড়ি চলবে না। বিআরটিএ-ও এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছে। রুট পারমিটবিহীন এলাকায় কোনও গাড়ি ঢুকতে পারবে না। সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে মালিক সমিতি তার সঙ্গে একমত।’
তবে শিক্ষার্থী চাপা দেওয়ার ঘটনার পর বাসটির মালিক গোপাল চন্দ্র কর্মকার ও কোম্পানির চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন। সে থেকে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বারবার চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বিআরটিএ’র ইঞ্জিনিয়ারিং উইংয়ের উপ-পরিচালক শফিকুজ্জামান ভূঞা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘সুপ্রভাত ও জাবালে নূরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তাদের চলাচল আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। বিআরটিএ‘র কাছে তাদের কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। আমরা কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করছি। বিআরটিএ ও পুলিশ যাচাই-বাছাই শেষ সিদ্ধান্ত নেবে।’
প্রসঙ্গত, গত ১৯ মার্চ রাজধানীর প্রগতি সরণি এলাকায় সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের চাপায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হন। এ ঘটনায় আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। পরে সুপ্রভাত পরিবহনের রুট পারমিট বন্ধ রাখা হয়।
আরও পড়ুন-
আবরারকে চাপা দেওয়া বাসের বিরুদ্ধে ছিল ২৭ মামলা
সুপ্রভাতের সেই বাসটি চালাচ্ছিল কন্ডাক্টর








