বিদেশি চ্যানেল বন্ধ বিতর্ক: দর্শক উসকে বিজ্ঞাপন ‘পাচার’!

উদিসা ইসলাম
০৩ এপ্রিল ২০১৯, ১০:৩৯আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:১৮

জি নেটওয়ার্ক

নিজেদের স্বার্থ হাসিল, সরকারকে চাপে ফেলে ফের বিদেশি চ্যানেলে দেশি বিজ্ঞাপনের অনুমতি নেওয়ার অপপ্রচারেই দেশে ভারতীয় চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টরা। তবে বন্ধ করল কারা সে বিষয়ে নানা পক্ষ নানা বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে।

তথ্য মন্ত্রণালয় বলছে, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চ্যানেলগুলো বন্ধ করতে বলা হয়নি। এসব চ্যানেলে বাংলাদেশি বিজ্ঞাপন সম্প্রচার হচ্ছে কি না, ক্যাবল অপারেটরদেরকে তা জানাতে বলা হয়েছে। ক্যাবল অপারেটরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা এই বন্ধ হওয়া বিষয়ে কিছুই জানেন না। বিজ্ঞাপন বন্ধ নিয়ে দুই রকমের চিঠি পেয়ে জি নেটওয়ার্কই চ্যানেল না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে।

মঙ্গলবার দুপুর নাগাদ বাংলাদেশে সর্বাধিক জনপ্রিয় ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিষ্ঠান জি নেটওয়ার্কের সব চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়! সিরিয়াল আর রিয়েলিটি শো’র মাধ্যমে এই চ্যানেলগুলো এদেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। হঠাৎ এতগুলো বিদেশি চ্যানেল বন্ধে ক্যাবল অপরারেটরদের কোনও হাত নেই উল্লেখ করে অপারেটর নেতা বলছেন, বিজ্ঞাপন না চালানোর বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরে মন্ত্রণালয় পর্যায়ের মিটিং হলেও সেখানে আমাদের ডাকা হয়নি। ফলে আমরা কিছু জানি না। বিদেশি চ্যানেলগুলোর স্থানীয় পরিবেশকদের মাধ্যমে এটি বন্ধ হয়ে থাকতে পারে। জিটিভি ও সারা বাংলার প্রধান সম্পাদক বলছেন, চাপ প্রয়োগ করে বিদেশি চ্যানেলে দেশি বিজ্ঞাপন প্রচার অব্যাহত রাখতে বাধ্য করার হীন অপচেষ্টায় প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। দর্শককে উসকে দিয়ে উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কারা বন্ধ করল

চ্যানেলগুলো কারা বন্ধ করল এ নিয়ে পক্ষগুলো পরস্পরকে দোষারোপ করছে। ক্যাবল অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এসএম আনোয়ার পারভেজ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বিদেশি চ্যানেলগুলোর স্থানীয় পরিবেশক যারা আছে তারা করেছে, বন্ধ করার বিষয়ে অপারেটরদের কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। তিনি আরও বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে শুরুতে বলা হয়েছিল, বিদেশি চ্যানেলে বাংলাদেশি বিজ্ঞাপন দেখানো যাবে না। সে অনুযায়ী সেটা বন্ধ করা হয়েছে। এখন নতুন করে মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, কোনো পে-চ্যানেলে বিজ্ঞাপন থাকতে পারবে না। দুইরকম কথার জন্য জি নেটওয়ার্কের চ্যানেলগুলো বাংলাদেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সিনিয়র সাংবাদিক ইশতিয়াক রেজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা চ্যানেল বন্ধের কথা কখনও বলিনি, ক্যাবল অপারেটররা সরকারের ওপর চাপ দিতে, দর্শকদের উসকানি দিতে সরাসরি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে। এটা গর্হিত অপচেষ্টা। তথ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বা আমাদের চাওয়ায় কোথাও চ্যানেল বন্ধের কথা ছিল না। আমরা চেয়েছি বিজ্ঞাপন বন্ধ হোক।

কীভাবে শুরু

বহুদিন থেকেই দেশের বিজ্ঞাপন বিদেশের চ্যানেলে চলে যাওয়া এবং এজন্য দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো রুগ্‌ণ দশা নিয়ে কথা বলে আসছিলেন টেলিভিশন মালিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে টেলিভিশন সাংবাদিকদের নবগঠিত প্ল্যাটফর্ম সম্প্রচার সাংবাদিক কেন্দ্রর উদ্বোধন ও সম্প্রচার সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, দেশের ক্যাবল অপারেটররা ডাউনলিংক করে বিদেশি চ্যানেল প্রদর্শন করছেন৷ সরকারের অনুমতি ছাড়া ও কর না দিয়ে বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার করা আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।

সোমবার থেকে জি নেটওয়ার্কের টেলিভিশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদেরও বলেন, সরকার কোনও চ্যানেল বন্ধ করেনি। শুধু টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন লঙ্ঘন করে বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার করায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে।

আইন কী বলে

ক্যাবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন ২০০৬-এর উপধারা-১৯(১৩)-এর বিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিদেশি কোনও চ্যানেলে কোনও ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার করা যায় না। শুধু দেশীয় বিজ্ঞাপন নয়, কোনও ধরনের বিজ্ঞাপন দেখানো যায় না। এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ১ এপ্রিল যে দুটি চ্যানেলকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, এই দুটি চ্যানেল বিদেশি বিজ্ঞাপন নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রচার করছিল। এই উদ্যোগ টেলিভিশনের মালিক, সাংবাদিক, কলাকুশলীদের স্বার্থের জন্যই নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদেশে বিজ্ঞাপন প্রচারের কারণে বছরে ৫০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছিল, হচ্ছিল না

১ এপ্রিল যে দুটি চ্যানেলকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, এই দুটি চ্যানেল বিদেশি বিজ্ঞাপন নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রচার করছিলেন বলে তথ্যমন্ত্রী দাবি করলেও কোয়াবের আনোয়ার পারভেজ বলছেন তারা গত ৫ বছর আগে থেকেই এর বিপক্ষে কথা বলে আসছেন এবং এক বছর আগে থেকেই বিজ্ঞাপন বন্ধ আছে। বাংলাদেশের কোনও বিজ্ঞাপন এখন প্রচার হয় না।

গ্রে অ্যাডভার্টাইজ লিমিটেডের ম্যানেজিং পার্টনার ও কান্ট্রি হেড গাউসুল আলম শাওন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিজ্ঞাপন তো অনেক দিন ধরে বন্ধ, যখন দিত এত বেশি পরিমাণ ছিল না। এসব পাঁচশ’ কোটির হিসাব কারা দেয়? চ্যানেল বন্ধ হওয়া উচিত না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমি এটা সমর্থন করি না। আমি সবই দেখতে চাইব। নেটফ্লিক্স ৩শ’ কোটি টাকা নিয়ে যায়, তখন কেউ কিছু বলেছে?’

বিজ্ঞাপন ফেরাতে উদ্যোগ যথাযথ

এদিকে পাচার হয়ে যাওয়া বিজ্ঞাপন দেশে ফেরাতে উদ্যোগ যথাযথ বলে মত প্রকাশ করেন বেঞ্চমার্কের সিইও আশরাফ কায়সার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিদেশি চ্যানেলে যে বিজ্ঞাপন চলে যাচ্ছিল তা আরও আগেই বন্ধ করা উচিত ছিল। সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে, কড়াকড়িভাবে বাস্তবায়ন দরকার। পৃথিবী এখন খোলা, এখন কোনও চ্যানেল বন্ধ হোক এটা কেউ চাই না। কিন্তু প্রচার হতে হবে আইন মেনে।’

সিনিয়র সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, দেশীয় চ্যানেলের রুগ্‌ণ অবস্থা তৈরি হচ্ছে, কারণ স্থানীয় বিজ্ঞাপন বিদেশি চ্যানেলে চলে যাচ্ছে। কোনও আইনেই আমাদের দেশি বিজ্ঞাপন বিদেশি চ্যানেলে প্রচার হতে পারে না। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ীও সারা পৃথিবীতে নিয়ম আমার টেলিভিশনে আমার দেশে যে বিজ্ঞাপন দেখা যায় সেটা অন্য কোথাও দেখা যাবে না। কিন্তু ভারতীয় চ্যানেলগুলোকে কেন্দ্র করে এই ব্যবসা জমে উঠেছে। এখানে আমাদের একটা চক্র এই বিজ্ঞাপন বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে, এর পরিমাণ ৫শ’ কোটি টাকা। এই টাকা লোকাল মার্কেটে ফেরত আসলে আমাদের রুগ্‌ণ অবস্থা কাটত, চ্যানেলগুলোর আর্থিক উন্নতি হতো এবং একইসঙ্গে আমরা কনটেন্টে মনোনিবেশ করতে পারতাম।

তবে কনটেন্ট বিষয়ে গাউসুল আজম শাওন বলেন, ৫শ’ কোটি টাকা কে নির্ধারণ করল, সেই গবেষণার কাগজপত্র কার কাছে আছে। এটা এত বিশাল কিছু হওয়ার কথা না। অন্যে কী করল তা না দেখে আমাদের চ্যানেলগুলোর উচিত হবে নিজেদের কনটেন্ট ও কৌশল নিয়ে কাজ করা।

/টিএন/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম