রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘আমরা তাদের ভিন্ন চোখে দেখি’। বুধবার (১০ এপ্রিল) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস, বাংলাদেশ (রিইব) এর ‘বীরাঙ্গনাদের সাক্ষ্য সংগ্রহের জন্য প্রণীত নির্দেশিকা ও সচিত্র কাহিনী প্রকাশনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমাদের সমাজ তাদের এই অবদানকে স্বীকৃতি দেয় না। তাদের আমরা ভিন্ন চোখে দেখি। বর্তমানে যে সামাজিক অবস্থান, সেই কারণেই অনেকে আর সেই দুঃসহ স্মৃতির কথাগুলো বলে না। সাহস নিয়ে কিছু মানুষ বলছে, যদিও তার সংখ্যা খুবই নগণ্য। এটা এখন আর কেউ স্বীকার করতেও চায় না। পুরনো স্মৃতি আর মনে করতে চায় না।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। তাদের মর্যাদা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবন ধারনের জন্য ভাতার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সমাজে যাতে তারা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে, তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীন হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধু সেই সব মা-বোনদের আশ্রয়ের জন্য প্রায় প্রতিটি জেলায় একটা করে ক্যাম্প করেছিলেন। থাকা-খাওয়া ও তারা যেন কাজ করে চলতে পারেন সে ব্যবস্থা করেছিলেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর, সেইসব ক্যাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। রেশন, টাকা-পয়সা সব বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়া হলো। এ অবস্থায় তারা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? কোথায় আশ্রয় নেবে? কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছেন। কেউ কেউ অত্যাচারিত, নিগৃহীত হয়ে কোনও মতে বেঁচে আছেন।’
মোজাম্মেল হক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর আবার সেই সব মা-বোনদের খবর নেওয়া শুরু করেন। ইতোমধ্যেই তাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের পুনর্বসন, তাদের চলার জন্য ভাতা দেওয়া শুরু করেছেন। আমাদের নেত্রী তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।’
মন্ত্রী বলেন, ‘তারা কলঙ্কিত নয়, তারা দেশের জন্য। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এর জন্য তো তারা দায়ী নয়। সে জন্য দায়ী হচ্ছে ওই সব নরপশুরা এবং তাদের সহযোগীরা। আমাদের স্বাধীনতার জন্য যারা এত বড় ত্যাগ শিকার করলো তাদের স্বীকৃতি দিলাম না। যার ফলে ওনারা লজ্জায় অনেকে আত্মহত্যা করেছেন। অনেকে এখন আর পরিচয় দিতে চায় না। আমরা যখন তালিকা করছি, ব্যক্তিগতভাবে যাদের সঙ্গে পরিচয় আছে, তাদের যখন বলি তারা অস্বীকার করে যায়। বলে, আর বলতে চাই না। প্রায় ৫০ বছরে আমরা সেই পুরনো ইতিহাসটা ভুলে গিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরে হলেও সেই বীরাঙ্গনা মা-বোনেদের নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। তাদের ত্যাগ রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। জাতীয়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। আমি সেই জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যারা গবেষণা করে তাদের (বীরাঙ্গনা) সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের জন্য, সামাজিক স্বীকৃতি জন্য যারা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন, আন্দোলন করে যাচ্ছেন, মিছিল-মিটিং করে যাচ্ছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমরা যা করতে পারিনি, বেসরকারিভাবে হলেও আপনারা তা করেছেন বা ধরে রেখেছেন।’
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশব্যাপী বীরমুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের অবদান লিপিবদ্ধ করার জন্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ জন্য গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণের জন্যও তিনি আহ্বান করেন।’
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও অতিথিরা বীরাঙ্গনাদের সাক্ষ্য সংগ্রহের জন্য প্রণীত নির্দেশিকা ও সচিত্র কাহিনীবিষয়ক প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করেন। এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন—ডারহাম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও বিশিষ্ট গবেষক ড. নয়নিকা মুখার্জি, চিত্রিত উপন্যাসের চিত্রশিল্পী নাজমুন নাহার কেয়া প্রমুখ।








