শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের মাত্রা ও উৎসগত ভিন্নতার কারণে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশবাদী ও আইনজীবীরা। তারা বলছেন, এই আইনটি শুরু থেকেই দুর্বল। এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলেও দূষণ ঠেকানো যাবে না। তারা আরও বলছেন, আগে যে অনুষ্ঠানে দুটি মাইক ব্যবহার করা হতো, সময়ের ব্যবধানে সেই অনুষ্ঠানে এখন ১০টি পর্যন্ত মাইক ব্যবহার করতে দেখা যায়। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের আইনেও পরিবর্তন দরকার।
‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬’ এ উল্লেখ আছে— আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা হতে ৫০০ মিটারের মধ্যে নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে ইট বা পাথর ভাঙার মেশিন ব্যবহার করা যাবে না এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত মিকচার মেশিনসহ নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য যন্ত্র বা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে না৷ বিধিমালার আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে৷ আইনে ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ আরও কিছু বিষয়ে ব্যতিক্রম আছে। তবে সর্বোচ্চ পাঁচ ঘণ্টা এবং রাত ১০টার পর কোনোভাবেই উচ্চ শব্দের কোনও অনুষ্ঠান করা যাবে না।
বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী, এলাকাভেদে শব্দের মানমাত্রা নীরব এলাকায়— দিনে ৫০ ডেসিবেল ও রাতে ৪০ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকায়— দিনে ৫৫ ডেসিবেল, ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল। মিশ্র এলাকায়— দিনে ৬০ ডেসিবেল ও রাতে ৫০ ডেসিবেল। বাণিজ্যিক এলাকায়— দিনে ৭০ ডেসিবেল ও রাতে ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায়— দিনে ৭৫ ডেসিবেল ও রাতে ৭০ ডেসিবেল। এখানে দিন বলতে ভোর ছয়টা থেকে রাত নয়টা এবং রাত বলতে রাত নয়টা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে এবং শব্দের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
যদিও বেসরকারি সংস্থা ‘ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট' ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটি স্থানের শব্দ পরিমাপ করে প্রতিবেদন হাজির করে দেখিয়েছে, নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে ঢাকায় গড়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি শব্দ সৃষ্টি হয়। জরিপে দেখা গেছে, মিরপুর, ধানমন্ডি, শাহবাগসহ প্রধান প্রধান এলাকায় শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৯৬ ডেসিবেল থেকে ১০৭ দশমিক ১ ডেসিবেল।
প্রতি্ষ্ঠানটির সিনিয়র প্রকল্প পরিচালক জিয়াউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা গতবছর জানুয়ারিতে শেষবারের মতো জরিপ করেছিলেন। তবে পরিস্থিতি এখন আরও খারাপ।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘শব্দদূষণ প্রতিরোধ করতে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি এই একবছরে। এখন শব্দ উৎপন্ন করে যেসব জিনিস সেসবে আগের চেয়ে ভিন্নতা ও তীক্ষ্ণতা এসেছে। এটি বিবেচনায় নিয়ে আইন পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। মানুষ আগে অনেক বেশি মানবিক ছিল, প্রতিবেশি বা আশেপাশের মানুষের সমস্যা দেখতো, নিজেদের ভেতরে কথা বলে সমাধান করা যেত। এখন আর তা হয় না। ফলে অনুমতি নিয়েও ৫ ঘণ্টার বেশি শব্দ করা যাবে না —এটি মানার প্রবণতাও কম।’
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, মসজিদ-মন্দির-গির্জা- প্যাগোডা বা অন্য কোনও ধর্মীয় উপসনালয়, ঈদের জামাত, ওয়াজ মাহফিল, নামকীর্তন, শবযাত্রা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রচার, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস, বিজয় দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি, পহেলা বৈশাখ, মহররম বা সরকার কর্তৃক ঘোষিত অন্যকোনও গুরুত্বপূর্ণ দিবসের অনুষ্ঠান চলাকালে এই বিধিমালা প্রযোজ্য হবে না।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক ধরনের বধিরতা আছে— কানে কম শোনে, অনেক শব্দের মধ্যে চিৎকার দিয়ে কথা বলে।’ তিনি বলেন, ‘শব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এই চিন্তাধারাই যেন আর কাজ করছে না, যার যেভাবে খুশি শব্দ উৎপন্ন করছে। সেসব নিয়ন্ত্রণের রাস্তা দেখানো আইনগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনের দাবি রাখে। কেননা, কিছুদিন পরপর পরিবর্তন হয় শব্দের উৎস, বৈচিত্র্য যেমন আসে তেমনই ভিন্নতা দেখা যায়। এখনকার সময়কে আপনি চাইলেই কুড়ি বছর আগের সময় দিয়ে বিবেচনা করতে পারবেন না। ফলে আইন পরিবর্তন না করে নতুন শব্দ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না।’
পরিবেশ বিষয়ের আইনজীবী সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান বলেন, ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে যে বিধিমালা রয়েছে, তার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করলেও দৈনন্দিন জীবনের যে আওয়াজ সেটা থেকে আপনি মুক্তি পাবেন না। কেননা, কৌশলে এই আইন থেকে জেনারেটর থেকে উৎপাদিত শব্দ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে আইনটিই ঢেলে সাজানো দরকার। যে পরিমাণ দূষণ হয় তা ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক বিকাশে কী পরিমাণ ক্ষতি করে, সেটা নিয়ে নতুন গবেষণার দরকার নেই। অতি দুর্বল শব্দদূষণ বিধিমালা এর প্রমাণ। এত ধরনের ক্ষতির কথা জানার পরেও যখন দুর্বল একটি বিধিমালা হাজির করা হয় এবং সেটিও প্রয়োগে মনোযোগ দেখা না যায়, তখন ধরেই নিতে হবে আসলে কর্তৃপক্ষের খুব একটা ইচ্ছে নেই। আমাদের উচিত হবে আইনটি নিয়ে নতুন করে ভাবা। এর প্রয়োজনীয়তা যদি কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করতে না পারে, তবে নীতিনির্ধারকদের একদিন এসি গাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে যাতায়াত করার পরামর্শ থাকলো, তাহলে তারা শব্দদূষণের করণীয় নির্ধারণ করতে পারবেন।’








