প্রতি বছরই ঈদুল আজহার দিনে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখে কওমি মাদ্রাসাগুলো। রাজধানীসহ সারাদেশেই চামড়া সংগ্রহ ও স্বল্পমূল্যে চামড়া কেনায় স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। ব্যতিক্রম হয়নি এবছরও। রাজধানীর বিভিন্ন মাদ্রাসার একটি বড় অংশের ছাত্ররা চামড়া সংগ্রহের জন্য ঢাকায় অবস্থান করছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার কওমি মাদ্রাসায় খোঁজ নিয়ে এই তথ্য জানা গেছে।
কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বলছে, কোনও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ নয়, বরং শিক্ষার্থীরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই চামড়া সংগ্রহের কাজে যোগ দিচ্ছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, লালবাগ, আজিমপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকার কয়েকটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু মাদ্রাসায় ‘শরহে জামী জামাত’ (দশম শ্রেণি) পর্যন্ত ছুটি দেওয়া হয়েছে। এর ওপরের শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়া হয়নি। আবার কিছু মাদ্রাসায় নিচের দিকে অন্তত তিনটি শ্রেণি বাদে বাকি সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরই ঈদের দিন চামড়া সংগ্রহ করে বিকালে বা পরদিন ছুটিতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
যাত্রাবাড়ী এলাকার একটি বড় কওমি মাদ্রাসার একজন শিক্ষার্থী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের মাদ্রাসায় দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছুটি দেওয়া হয়েছে। বাকিরা থাকবেন কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করার জন্য।’
শিক্ষার্থীরা জানান, কোরবানির দিন ভোরেই তারা ফজরের নামাজ পড়ে মাদ্রাসার আয়োজনে গরুর মাংস ও সেমাই-ফিরনি খেয়ে গরু জবাই ও চামড়া সংগ্রহের কাজে বেরিয়ে পড়েন। এরপর বিকালের মধ্যে মাদ্রাসায় চামড়া পৌঁছে দিয়ে বাড়ির পথ ধরেন।
শিক্ষার্থীরা এ-ও জানান, তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে চাইলে অভিভাবকদের সম্মতিতে ছুটি নিতে পারেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই স্থানীয়ভাবে চামড়ার মূল্য সংগ্রহ করে মাদ্রাসায় জমা দিতে বলা হয়।
জানতে চাইলে বিষয়টি স্বীকার করেন রাজধানীর লালবাগের একটি কওমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসায় লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের বিশাল ব্যয় রয়েছে। এই বোর্ডিংয়ের মাধ্যমে দরিদ্র, অসহায়, এতিম শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে খাবার গ্রহণ করে। এই বোর্ডিং থেকে কোথাও দুই বেলা, কোথাও তিনবেলা খাবার দেওয়া হয়। এই ব্যয় সাধারণত জাকাত ও কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির খাত থেকে ব্যয় হয়ে থাকে।’
কারণ, ব্যাখ্যা করে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, ‘লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রদের চামড়া সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হয়। কোনও জবরদস্তি, থাকতে বাধ্য করা হয় না। তবে, ঈদের সময় দিনের কাজে যুক্ত থাকতে ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। অনুপ্রাণিত করা হয়। তারা সে অনুপ্রেরণায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করেন। ফলে, জোরপূর্বক কাউকে ব্যবহার করা হয় না। আমাদের ছাত্রজীবনেও আমরা এটা করেছি। এটা যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে। এছাড়া, ছুটি পাওয়ার জন্য শর্ত হিসেবে কোনও টাকা চাওয়া হয় না, তবে, তাদের উদ্বুদ্ধ করা হয় যে, তাদের এলাকায় চামড়ার মূল্য তারা যেন মাদ্রাসায় জমা দেন।’
প্রসঙ্গত, কোরবানির পশু জবাই ও চামড়া সংগ্রহের কাজে অন্তত ১৮ বছরের নিচের কাউকে যেন যুক্ত না করা হয় এ নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনা ছিল। ২০১৬ সালের ১১ আগস্টে কোরবানির আগে তৎকালীন স্থানীয় সরকার সচিব আব্দুল মালেক বলেছিলেন, ‘১৮ বছরের কম বয়সী মাদ্রাসা-ছাত্রদের কোরবানির পশু জবাইয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে না। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য সিটি করপোরেশনগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনগুলো মাঠ পর্যায় বিষয়টি নজরদারি করবে।’ এর কারণ হিসেবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের শারীরিক ও মানসিক অপরিপক্বতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। যদিও ওই বছরই এ নির্দেশনা মানেনি সিটি করপোরেশন। বিষয়টি নিয়ে ‘সরকারের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা, শিশুদের দিয়েও পশু জবাই’ শিরোনামে বাংলা ট্রিবিউনে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল।
কওমি মাদ্রাসা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে মক্তব, ফোরকানিয়া ও কোরানিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসার সংখ্যা ১৪ হাজার ৯৩১টি। এই মাদ্রাসাগুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। জাকাত, কোরবানির পশুর চামড়া ও চামড়া বিক্রীত অর্থ কওমি মাদ্রাসার আয়ের অন্যতম উৎস। শুধু এই ঈদুল আজহার সময়েই কোরবানির পশুর চামড়া থেকে কমপক্ষে চার মাসের ব্যয় মেটানো সম্ভব হয় বলে জানিয়েছেন মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা। মাদ্রাসার জন্য চামড়া সংগ্রহ করতে শিক্ষকদের নেতৃত্বে ছাত্ররা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে থাকেন। মাদ্রাসা-শিক্ষার্থীরা কোরবানির পশু জবাই করে। যাদের মধ্য ১৮ বছরের কম বয়সী ছাত্ররাও থাকে।
সিটি করপোরেশনগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ১৮ বছরের নিচের বয়সীদের কোরবানির পশু জবাইয়ের কাজে ব্যবহার না করার বিষয়ে কোনও ধরনের নির্দেশনা আসেনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক উপদেষ্টা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউটনকে বলেন, ‘কোরবানি সংশ্লিষ্ট সব মিটিংয়ে আমি থাকি। কিন্তু এ বছর এমন কোনও সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা, জানা নেই। তবে বিষয়টি তো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দেখার কথা।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় চেয়ারম্যান মুফতি গোলাম রাব্বানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৫ বছর হলেই প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে বিবেচিত হয়। সেদিক থেকে ১৮ বছরের বয়সের ছেলেরাও প্রাপ্তবয়স্ক। আর আমাদের দেশে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কোনও চাপ দেওয়া হয় না। যারা কাজ করে তারা স্বেচ্ছায় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কাজ করে।’
গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘আমি এ বছর খোঁজ নিয়েছি, যারা যাবে, তারা স্বেচ্ছায় যাবে। আমার ছেলেও পড়ে, তাকেও ছুটি দেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসাগুলো যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে কোরবানির বিষয়টির ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। সে কারণে বাড়িতে গেলে শিক্ষার্থীদের বলা হয়, তারা যেন নিজ নিজ এলাকার চামড়ার মূল্য সংগ্রহ করে মাদ্রাসায় দেয়।’ বিষয়টিকে খুব স্বাভাবিক বলেও তিনি মনে করেন।
আরও পড়ুন:
চামড়া খুঁজে হয়রান মাদ্রাসার শিশুরা, চুপচাপ বেফাক
চামড়া সংগ্রহে কওমি মাদ্রাসার শিশুরা







