রোহিঙ্গা সমস্যায় মিয়ানমারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতে তিন মেকানিজম

শেখ শাহরিয়ার জামান
২৩ আগস্ট ২০১৯, ১৭:৪২আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৯, ১৮:২১

রোহিঙ্গা (ছবি: সংগৃহীত) মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ অন্যান্য অমানবিক কাজকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি করেছে সে দেশের সামরিক বাহিনী। তাদের নির্যাতনে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের অপরাধীদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য তিনটি উপায়ে কাজ করছে। সেগুলো হচ্ছে– ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি), ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস (আইসিজে) এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট

রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের এখতিয়ার আছে কিনা জানার জন্য ওই কোর্টের প্রধান কৌঁসুলি ফেতু বেনসুদা ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল একটি আবেদন করে। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত এবং যদি প্রয়োজন হয় এর বিচার করাই ফেতু বেনসুদার উদ্দেশ্য ছিল। এজন্য তিনি কোর্টের অনুমতি চেয়ে এই আবেদন করেন।

একই বছরের ৭ মে কোর্ট এ বিষয়ে বাংলাদেশের মতামত চাইলে এক মাসের মধ্যে সরকার তাদের মতামত গোপনীয়ভাবে জানায়। এরপর ২১ জুন মিয়ানমারের মতামত জানতে চান কোর্ট; কিন্তু মিয়ানমার কোনও মতামত দিতে অস্বীকার করে।

কোর্ট সব বিষয় বিবেচনা করে ৬ সেপ্টেম্বর অনুকূল রায় দেন। কোর্ট বলেন, ‘অপরাধসংক্রান্ত বিচার প্রত্যাবাসনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’

গত মাসে ফেতু বেনসুদা আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করার অনুমতি চাইলে কোর্ট অসহায় ব্যক্তিদের কাছ থেকে নির্যাতনের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চান। এই প্রক্রিয়া আগামী অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। আশা করা হচ্ছে তারপরে আইসিসি তাদের তদন্ত শুরু করবে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশে তদন্ত করার বিষয়ে একটি চুক্তি সইয়ের জন্য আমরা এখন আইসিসির সঙ্গে আলোচনা করছি।’ এটি একটি রুটিন বিষয়। কারণ, যে দেশে আইসিসি তদন্ত করতে যায় তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি করে থাকে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন,  ‘তদন্ত কবে শুরু হবে এটি আইসিসির বিষয়। এ বিষয়ে সরকারের কোনও ভূমিকা থাকবে না।’

ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস

অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) উদ্যোগে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিসে (আইসিজে) রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি মামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত মে মাসের ৩১ তারিখ মক্কাতে অনুষ্ঠিত ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, ‘গাম্বিয়ার নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রী পর্যায়ের অ্যাডহক কমিটিকে আহ্বান করা হচ্ছে– তারা যেন অবিলম্বে ওআইসির পক্ষ থেকে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিসে মামলা করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইতোমধ্যে গাম্বিয়া তাদের পরিকল্পনা সদস্য দেশগুলোর কাছে হস্তান্তর করেছে। আমরা আশা করছি, তারা মামলাটি কীভাবে করবে সেটি নিয়ে কাজ শুরু করবে।’

তিনি বলেন, ‘আইসিজে অন্য কোর্ট যেমন– আইসিসি থেকে আলাদা। আইসিজে একটি দেশের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে কাজ করে; কিন্তু আইসিসি একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে কাজ করে।’ যদি ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস থেকে অনুকূল রায় পাওয়া যায় তবে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি সহজ হবে বলে তিনি জানান।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার

জেনেভা-ভিত্তিক হিউমান রাইটস কাউন্সিলের উদ্যোগে এটি গঠিত হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, ২০১১ থেকে মিয়ানমারে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হয়েছে সে বিষয়ে তদন্ত করে প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা।

এ বছরের এপ্রিলে জাতিসংঘের মহাসচিব এন্টোনিও গুটেরেস ৩৫ বছর ধরে আইন পেশায় জড়িত যুক্তরাষ্ট্রের কৌঁসুলি নিকোলাস কুমজিয়ানকে এর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক বিচার কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘সিরিয়া নিয়ে জাতিসংঘের একই ধরনের একটি মেকানিজম আছে।’

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার কোনও কোর্টের অধীনে কাজ করে না।  তারা প্রমাণ সংগ্রহ করবে, বিশ্লেষণ করবে। কিন্তু বিচারিক কাজ করবে না বলে তিনি জানান।  এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও অন্যদের বিরুদ্ধে যে প্রমাণ সংগ্রহ করবে তা তারা যেকোনও জাতীয় কোর্ট বা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস অথবা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টে দাখিল করতে পারবে। তখন সেটি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।’

প্রসঙ্গত, যুগ যুগ ধরে রোহিঙ্গারা নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং অং সান সুচির নেতৃত্বে বেসামরিক সরকারের নিপীড়নের কারণে সব সময় তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত মিয়ানমার সরকারের নিয়মতান্ত্রিক নির্যাতনের কারণে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা ঘরছাড়া হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের উৎখাত করার জন্য তাদের ওপর আবারও চরম নির্যাতন শুরু করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। ধারণা করা হয়, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে ২৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। অসংখ্য নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। প্রায় ৪০০ গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

/এসএসজেড/এমএএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম