আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশ জ্বলছে। টানা ছয় দিনের হরতাল পার করে এসে সবাই অপেক্ষায় রয়েছে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার। এই দিনেই বঙ্গবন্ধু অসহযোগসহ বেশকিছু প্রশাসনিক নির্দেশনা দেন এবং এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে প্রত্যেককে প্রস্তুত হয়ে যেতে বলেন। এরপর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীনতা লাভ করে জন্ম হয় বাংলাদেশের। ঠিক একবছর পরে ১৯৭২ সালে এসে সেই ঐতিহাসিক দিনে আরেকটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত প্রণীত হয়। ১৯৭২ সালের এই দিনে গঠিত হয় জাতীয় রক্ষী বাহিনী, যার সম্ভাবনার কথা বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই বলে আসছিলেন।
রক্ষী বাহিনী গঠন
১৯৭২ সালে ২১ নম্বর প্রেসিডেন্ট অর্ডারে রক্ষি বাহিনী গঠিত হয়। গেজেট অনুযায়ী, ১৯৭২ সালের ৭ মার্চ প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরী এতে স্বাক্ষর করেন। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) থেকে প্রকাশিত মওদুদ আহমদের ‘বাংলাদেশ: শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল’ বইতে এ তথ্য দেওয়া আছে। ডেইলি অবজারভারের পরের দিনের পত্রিকার প্রথম ও শেষ পাতা মিলিয়ে রক্ষি বাহিনী গঠনের বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করা হয়।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে যুদ্ধ ফেরত বিপুলসংখক তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মসংস্থানের জন্য ১৯৭২ সালের শুরুতে ‘জাতীয় রক্ষী বাহিনী’ গঠিত হয়। ১৯৭২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি বাহিনীর সব সদস্যকে ২৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিজ নিজ ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘এই তারিখের মধ্যে ক্যাম্প ছেড়ে গিয়ে মুক্তি বাহিনীর সদস্যরা ইচ্ছা করলে জাতীয় রক্ষী বাহিনী অথবা পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিতে পারেন।’
খসড়া শাসনতন্ত্র রচনা সমাপ্তি পর্যায়ে
বাংলাদেশের একটি খসড়া শাসনতন্ত্র রচনার কাজ বর্তমানে সমাপ্তির পর্যায়ে রয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশ করে পত্রিকাগুলো। সরকারি এক সূত্রের বরাত দিয়ে তথ্য উল্লেখ করে বলা হয় যে, খসড়া শাসনতন্ত্র পাস করা হলেই বর্তমান গণপরিষদ দেশের পার্লামেন্ট হিসেবে কাজ করবে। শিগগিরই দেশে সাধারণ নির্বাচনের কোনও সম্ভাবনা আছে কিনা, প্রশ্ন করা হলে সরকারি সূত্রে বলা হয়— দেশে যখন গঠনতন্ত্র আছে সাধারণ নির্বাচন হবে। তবে ঠিক কবে নাগাদ হবে, তা বলা যাচ্ছে না। সূত্রটি আরও জানায়, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে পাকিস্তানি বাহিনী যেসব সদস্যকে (গণপরিষদের সদস্য) হত্যা করেছে, তাদের আসনগুলোতে উপনির্বাচন হবে।
একাত্তরের ৭ মার্চ
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে অনন্য একটি দিন। আজকের দিনে ছয় দিনের বিক্ষোভ হরতাল শেষে সবার কান রেসকোর্সের দিকে— বঙ্গবন্ধু কী বলবেন সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করেছিলেন, সেই মুহূর্তের জন্য। সবাই ভাবছিলেন বঙ্গবন্ধু আজ নিশ্চয়ই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের প্রতি নতুন নির্দেশ ও অধিবেশনে যোগদানের চারটি শর্ত প্রদান করেন। অধিবেশনে যোগদানে বঙ্গবন্ধুর চার শর্ত—
১. অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করতে হবে, ২. সব সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, ৩. নিরস্ত্র গণহত্যার তদন্ত করতে হবে, ৪. নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
১৯৭১ সালের ৮ মার্চের ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে আগের দিনের জনসভার যে নির্দেশগুলোর উল্লেখ করা হয় সেগুলো হলো— ১. বাংলার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ রাখুন, ২. সমগ্র বাংলাদেশের সেক্রেটারিয়েট, সরকারি ও আধা সরকারি অফিস, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট এবং অন্যান্য কোর্টে হরতাল করুন। কোথাও শিথিল করা হলে জানানো হবে,৩. রিকশা, বেবি, বাস-ট্যাক্সি প্রভৃতি এবং রেলগাড়ি ও বন্দরগুলো চালু রাখুন। কিন্তু জনগণের ওপর জুলুম চালাবার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র বাহিনীর চলাচলের কাজে রেলওয়ে ও বন্দর কর্মচারীরা সহযোগিতা করবেন না এবং সেক্ষেত্রে তাদের চলাচলের ব্যাপারে কোনও কিছু ঘটলে আমি দায়ী হবো না, ৪. বেতার, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রসেবীরা আমাদের বিবৃতি-বক্তৃতার পূর্ণ বিবরণ প্রদান করবেন এবং গণআন্দোলনের কোনও খবর গায়েব করবেন না। যদি তাতে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাঙালিরা কাজে যোগ দেবেন না, ৫. শুধু লোকাল এবং আন্তঃজেলা ট্রাঙ্ককল-টেলিফোন যোগাযোগ অব্যাহত রাখুন, ৬. স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখুন, ৭. সব গৃহশীর্ষে প্রতিদিন কালো পতাকা উড্ডয়মান রাখুন, ৮. ব্যাংকগুলো প্রতিদিন দুই ঘণ্টা খোলা রাখুন, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও যেন পাচার না হয়, ৯. অন্যান্য ক্ষেত্রে আজ (৮ মার্চ) থেকে হরতাল প্রত্যাহার করা হলো। কিন্তু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যেকোনও সময় আবারও অংশিক বা সর্বাত্মক হরতাল ঘোষণা হতে পারে, তার জন্য প্রস্তুত থাকুন।
সোভিয়েতে বাংলার জয়
১৯৭২ সালের মার্চের শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধুর সোভিয়েত ইউনিয়নে সফর, একাত্তরে সোভিয়েতের সহযোগিতা এবং আগামী দিনের কর্মসূচি নিয়ে গণমাধ্যম ছিল সরব। তখনও পত্রিকা ও কূটনীতিক মহলে বঙ্গবন্ধুর সোভিয়েত সফরের নানা উদ্যোগের আলোচনা ঘুরে বেড়াচ্ছে। দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত সংবাদ বলছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন সক্রিয় সাহায্য ও দৃঢ় সমর্থন জানিয়েছিল, বর্তমানে বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে ঠিক তেমন করেই সাহায্য ও সহযোগিতা করবে বলে জানা গেছে। বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে এই আশ্বাস পেয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে বঙ্গবন্ধু পৌঁছানোর পর মুহূর্ত থেকে সেদেশের সরকার ও জনগণ তাঁর প্রতি ও তার সহযোগীদের প্রতি যে শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখিয়েছে, তা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক মহল। রাশিয়ার সরকার ও জনগণের কাছ থেকে এমন আন্তরিকতা, প্রাণঢালা সংবর্ধনা ও বিরল সম্মানের অধিকারী খুব কম জনই হয়েছেন।








