‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ফেরত মানুষেরাই করোনার চ্যালেঞ্জ’

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১২ এপ্রিল ২০২০, ১৬:৫৬আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২০, ১৭:০০

ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছবি- ফোকাস বাংলা ২

করোনাভাইরাস উপদ্রুত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে ফেরা মানুষদের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন দেশের অন্যান্য জেলার শীর্ষ কর্মকর্তারা। এ দুটি জায়গা থেকে আক্রান্ত মানুষ অন্যান্য জেলায় গিয়ে করোনা ছড়াচ্ছে বলে মনে করেন দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

রবিবার (১২ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নিয়ে বরিশাল ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে  ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে ফেরতদের চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর আগে গত ৭ এপ্রিল সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার প্রশাসনের পক্ষ থেকে একই চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আক্রান্ত জেলা থেকে কেউ যেন ঢুকতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন। যদি কেউ ঢুকেও তাদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের নমুনা পরীক্ষার নির্দেশ দেন।

রবিবার প্রধানমন্ত্রী বাগেরহাট, ঝালকাঠি, মেহেরপুর, ভোলা, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, ঝিনাইদহ, মাগুরা,  পিরোজপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, নড়াইল, বরিশাল ও খুলনা জেলার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করেন। গণভবন থেকে অনুষ্ঠিত এ ভিডিও কনফারেন্স সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস।

ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, ‘গত ২/৩ দিনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং শরীয়তপুর ও মাদারীপুর থেকে লকডাউন উপেক্ষা করে শ্রমজীবীরা সাতক্ষীরা জেলায় প্রবেশ করেছেন। সীমান্ত চৌকিতে তাদের আমরা চিহ্নিত করে হোম কোয়ারেন্টিনে নিয়ে এসেছি। এই মুহূর্তে এসব শ্রমজীবী হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন। উপজেলা প্রশাসন তাদের দেখভাল করছে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে লোকজন আসায় জেলাবাসী কিছুটা শঙ্কিত রয়েছে। তবে আমরা কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছি।’

ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ প্রত্যাগতদের চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রচুর মানুষ চলে আসছে। ইতোমধ্যে আমাদের দুটি গ্রামে ১৩০ জন মানুষ এসে উঠেছে। আমরা তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করছি। তারা যাতে খাদ্যসংকটে না ভোগে, সে জন্য তাদের খাদ্য সহায়তা দিচ্ছি। তাদের আমরা কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করেছি। তারা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরেও আমরা তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছি।’

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন খান বলেন, ‘গত কয়েকদিন বন্ধের মধ্যেও ঢাকা থেকে বেশকিছু মানুষ এসেছিল। এখনও বিভিন্নভাবে আসছে। আমরা তো সবাইকে আটকাতে পারবো না। এজন্য সবার নাম ও ঠিকানা নিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার প্রশাসনকে জানিয়ে দিচ্ছি। তারা যেন তাদের ফোন করে কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করেন। আমরা বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করেছি। ইতোমধ্যে তাদের কোয়ারেন্টিন প্রায় শেষ হয়েছে। কিন্তু ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জ বা অন্যান্য আক্রান্ত এলাকা থেকে যারা আসছে, তারা এখন আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য আমরা এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এসব জায়গা থেকে যারা আসছে, তাদের আমরা বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করছি। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটা প্রবণতা থাকে— তারা কোনও কোনও পথে লুকিয়ে আসছে।’

একই ধরনের বক্তব্য দেন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ইয়াসিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টস শ্রমিক এবং ইটভাটার শ্রমিক যারা দ্বিতীয়বারের মতো বিভাগে প্রবেশ করেছে। তাদের মাধ্যমে রোগটি ছড়াচ্ছে। আমাদের এখানে দুজন মারা গেছে। তাদের মধ্যে একজন  সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছে। গতকাল (শনিবার) করোনাভাইরাস যাদের চিহ্নিত হয়েছে, তারা নারায়ণগঞ্জ থেকে আগত। নারায়ণগঞ্জ থেকে আসার পরই বন্ধ করার জন্য আমরা নৌ পুলিশসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালযয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। এরপর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এজন্য গতকাল থেকে আসার প্রবণতা কিছুটা কম দেখতে পাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘বরিশাল বিভাগে বর্তমানে ২৬৭ জন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে আছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই নারায়ণগঞ্জ প্রত্যাগত।’

জেলায় বহিরাগত প্রবেশের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাইরে থেকে আসা লোক দিয়েই করোনাভাইরাস ছড়ায়— এটা ভালোভাবে লক্ষ্য রাখা উচিত। কেউ গেলেই তাকে কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে। তাদের পরীক্ষা করতে হবে৷ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই কারণে ভাইরাসে আক্রান্ত তারাই হচ্ছে— যারা বাইরে থেকে কোনও জায়গায় যাচ্ছে। এজন্য কয়েকটা দিন আপনারা নিজেদের এলাকা সুরক্ষিত করুন। এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় যেতে দেবেন না। অকারণে কেউ ছোটাছুটি করবেন না। কেউ শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে যাবেন না, পরেও যেতে পারবেন। এই ধরনের বন্ধ রেখে নিজেদের সুরক্ষিত করুন। সবার জন্য এই দুর্যোগ থেকে যেন রেহাই পাই, তার জন্য সহযোগিতা করেন।’

সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষের অহেতুক ঘোরাফেরার কারণে করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এটা চলতে থাকলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য আমরা যে নির্দেশনাগুলো দিচ্ছি, দয়া করে সবাই তা মেনে চলবেন।’

মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নিতে আমাদের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন মেহেরপুর যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আমি বলেছি, জেলায় ঢুকতে পারবে না। কারণ, ঢাকায় তো করোনাভাইরাস আছে। এজন্য তাকে আমি যেতে দেইনি। আমি সবাইকে বলেছি, যারা ঢাকায় আছেন ঢাকায় থাকতে হবে। এখান থেকে নির্দেশনা দেবেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশটা অত্যন্ত ছোট। খুবই ঘনবসতিপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে এই ভাইরাস থেকে জনগণকে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। প্রত্যেক মানুষকে নিজের কথা ভাবতে হবে। নিজের পরিবারের কথা ভাবতে হবে। পাড়া-প্রতিবেশীর কথা ভাবতে হবে— যাতে করে সবাই সুরক্ষিত থাকে। এজন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে ঘরে থাকতে হবে। এর থেকে যার যার এলাকায় সুরক্ষিত রাখবেন। হঠাৎ করে বাড়ি থেকে কাউকে যেতে দেবেন না।’

করোনাভাইরাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই দুষ্টু ভাইরাস সারাবিশ্বকে এক জায়গায় থমকে দিয়েছে। সব মানুষ ঘরে চলে গেছে। আমরা চাই, এই ভাইরাস থেকে মুক্ত হতে। চাই বিশ্বটা যেন এই ভাইরাস থেকে মুক্ত হয়।’

ত্রাণ চুরি হলে মোবাইল কোর্টে বিচার

মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা তুলে ধরেন। এ সময় তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘দুর্গতদের দেওয়া খাদ্যদ্রব্য নিয়ে কেউ অনিয়ম করলে বরদাস্ত করা হবে না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই দুর্যোগের সময় আমরা জনগণকে সহায়তা দিচ্ছি। এখান থেকে কেউ যদি দুর্নীতি করে, তাহলে তা কোনদিনও ক্ষমার যোগ্য নয়, আমরা ক্ষমা করবো না। আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, এ ধরনের কয়েকটি খবর বেরিয়েছে। ঘটনা ঘটিয়েছে। দুর্গত মানুষকে দেওয়া এই খাদ্যদ্রব্য থেকে যারা দুর্নীতি করার চেষ্টা করেছে। তাদের কিছু ধরা পড়েছে। অন্য কেউ করলেও ধরা পড়বে। আর তাদের ছাড়া হবে না। একজন হলে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। বিচার পরে দেখা যাবে।’

সবাইকে সতর্ক করে  তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকের আন্তরিক থাকতে হবে। যারা রাজনীতি করে তাদের দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। যারা সরকারি চাকরি করছেন বেতন পাচ্ছেন জনগণের ট্যাক্সের টাকায়। যাদের আমরা দায়িত্ব দিয়েছি, তারা কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সামান্য দু-একটি ঘটনা আমাদের অত্যন্ত কষ্ট দেয়। অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ, এটা কেউ করবেন না। আমি বলবো, এর ধরনের দুর্নীতি কোনোদিন বরদাস্ত করবো না।’

/ইএইচএস/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক