কোন শাড়িটা কে পরবে, সঙ্গে বাঙালি সাজে হাতের চুড়ি, কপালে টিপ। বেশ জমিয়ে পরিকল্পনা করছেন লগ্ন তানভীর। সঙ্গে মা, ছোট বোন ধারা আর খালা। কিন্তু, এত আয়োজন কেন? এবারের বর্ষবরণে বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। সেই ২১ মার্চ থেকে ঘরবন্দি সবাই। তবে? তাদের ভাষ্য, না হোক বের হওয়া। আমরা সবাই মিলে বেঁচে আছি। আগামী সময়টা আমাদের কেমন হবে জানি না। পরিবারের সদস্যরা মিলে তাই এ আয়োজন। মা কাকলী তানভীর দুপুরে এই কয়দিনের সাদামাটা খাবারের মধ্যে একটু ভিন্ন কিছু করার পরিকল্পনাও করেছেন। সেটা সারপ্রাইজ।
প্রায় মাসব্যাপী সাধারণ ছুটির মধ্যে এবারের পহেলা বৈশাখ এসেছে। সঙ্গে আছে করোনাভাইরাসের প্রকোপ আর শঙ্কা। সে কারণে এবার পারিবারিক আবহেই ঘরের ভেতরেই অন্যরকম একটা দিন আশা করছেন নগরবাসী। এবারের বৈশাখে হবে পারিবারিক সম্পর্কগুলো ঝালাই, সবাই আবদ্ধ হবেন দৃঢ় বন্ধনে। বৃহত্তর জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সবাইকে ঘরে বসেই নববর্ষ পালনের আহ্বান জানিয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তেমনটা প্রত্যাশা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা ঘরে বসেই এবারের নববর্ষের আনন্দ উপভোগ করবো। অতীতের সব জঞ্জাল-গ্লানি ধুয়ে-মুছে আমরা সামনে দৃপ্ত-পায়ে এগিয়ে যাবো; গড়বো আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যত। এবার সবাইকে অনুরোধ করবো কাঁচা আম, জাম, পেয়ারা, তরমুজ-সহ নানা মৌসুমি ফল সংগ্রহ করে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়িতে বসেই নববর্ষের আনন্দ উপভোগ করুন। আপনারা বিনা কারণে ঘরের বাইরে যাবেন না। অযথা কোথাও ভিড় করবেন না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করুন, পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করুন।’
করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে হলে সবচেয়ে বেশি জরুরি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। বাইরে বের হওয়া যাবে না, হলেও বাড়তি সতর্কতা নিয়ে। নগরজুড়ে অলিখিত লকডাউনই চলছে। এই সুযোগে পরিবারের একে অপরে আরেকটু কাছাকাছি আসছেন সেটা মন্দ না বলেন নিপাট গৃহিণী আনিসা ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রতিবার সে কী হল্লা। সকালে উঠে রমনায় বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে হাজিরা দেওয়া, ছেলের স্কুলের অনুষ্ঠান, গণমাধ্যমে কাজ করায় ছেলের বাবার এই দিনেও অফিস। এবার এসবই হয়তো মিস করবো। কিন্তু নিজেদের সুরক্ষায় এসব বিসর্জন দেওয়াও জরুরি। উৎসবের দিন পরিবারের সবাই একসঙ্গে থাকতে কেমন লাগে তাতো ভুলতেই বসেছিলাম। এবার সেটা পাওয়া হবে।’
এইচএসসি পরীক্ষার্থী লগ্ন তানভীর, মেকআপ আর্টিস্ট। বন্ধু স্বজনদের এরইমধ্যে কিছু মেকআপ টিপস দিচ্ছেন ব্যক্তিগতভাবে। করোনা আসার পরে কাজ বন্ধ, আর পরীক্ষাটাও কবে হবে জানেন না। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা বাসায় উদযাপন করবো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে সমালোচনা করছেন যেকোনও উদযাপনকে। কিন্তু, আমি মনে করি অন্যদের সাধ্যমতো সাহায্য সহযোগিতা করা যেমন জরুরি, নিজেদের বাঁচার তাগিদে জীবনটাকে চলতে দেওয়াও জরুরি।’
১৫ বছর বয়সী আইয়ান রশিদ বলেন, ‘অনেক শো-অফের কিছু নেই। কিন্তু আগামীর দিনগুলো যেন ভালো কাটে সেজন্যও এই দিনটি মন খারাপ না করে একটা স্পিরিট নিয়ে শুরু করা যেতে পারে।’
অভিনেত্রী শাহনাজ খুশি ফেসবুকে লিখেছেন ‘বৈশাখী ভালবাসাসহ বৈরী পরিস্থিতিতে বন্ধুর পাঠানো শাড়ি আর মাছের গল্প। তার পোস্টে লেখেন, সেদিন এক বন্ধু ফোন দিলো। কেমন আছি জিজ্ঞাসা না করেই বললো, ‘বাজার সদাই আছে তো, কী লাগবে বলো!’
আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম, সেই সঙ্গে খানিকটা আবেগী! কারণ,এমন প্রশ্নের জন্য এই দুঃসময়ে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আমি যেহেতু ১০ তারিখে ঘরে বন্দি হয়েছি, তাই বেশ কিছু জিনিসের প্রয়োজন থাকলেও আমি কৃতজ্ঞতাসহ আড়াল করলাম। এই দুর্দিনে এটুকু বলবার লোকও তো নাই সেটা ভেবে। অনেক প্রাণের গল্প হলো ঘণ্টা ভরে। কথার মধ্যে মাছ-ভাত খাওয়া হয় না, শুধু ডিম, এমন কিছু হয়তো ছিল। আজ সকালে তার পাঠানো এতগুলো অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা। ছোট মাছ কিনে প্রোসেস করে পাঠিয়েছে, সাথে এই লকডাউনে বন্দি বৈশাখের মুক্ত প্রেমস্বরূপ শাড়ি! এই মাছ হয়তো ৪/৫ দিনে শেষ হয়ে যাবে, আমার অনেক শাড়ির ভাঁজে হয়তো এই শাড়িটাও হারিয়ে যাবে, কিন্তু যে ভালোবাসা আমি পেয়ে গেলাম, তা আমৃত্যু আমার প্রাণে দ্যুতি ছড়াবে।’
শিক্ষক আরিফা রহমান রুমা পরিবারে কাটাবেন সময়টা। তিনি বলেন, নতুন বছর যেন সব অর্থেই আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে সেটা নিশ্চিত করতে ঘরে বসেই এবার নতুন বছরকে স্বাগত জানাবো। ঘরে থাকা মাছ আর সবজি থেকে কয়েক পদ করে বাচ্চাদের সামনে দেবো। শাড়ি, চুড়ি, টিপে নিজেকে সাজাবো আর ফোনে পরিবার বন্ধুদের শুভেচ্ছা জানাবো।
করোনা আক্রান্ত দেশের মানুষের ঘরে সাংগঠনিকভাবে খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছেন খান আসাদুজ্জামান মাসুম। তিনি বলেন, পাশের ঘরে না খেয়ে থাকা পরিবারটির খাবার ব্যবস্থা করে দেওয়াই হোক নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময়। এর বাইরে পরিবারের সদস্যরা যতটা সময় একসঙ্গে থাকা যায় সেই চেষ্টাও থাকবে।
তানজিনা ইমাম সঙ্গীতা মনে করেন, বাঙালি বীরের জাতি। আমরা হারতে জানি না। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, এ যুদ্ধেও জয় আমাদের হবেই। শুধু একটু সতর্কতা, সাবধানতা। ঘরে থাকা। নিয়ম মেনে চলা। অসহায় মানুষের পাশে থাকা। এটুকু করতে পারলেই আগামী ১৪২৮-এর বর্ষবরণে আমরা আবার উৎসবে মেতে উঠতে পারবো। এই আঁধার কেটে গিয়ে নব অরুণোদয় হবেই। সেদিনেই প্রতীক্ষায় এবারে বর্ষবরণ ঘরে থেকে নিজের মতো করে কাটাই।
অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত যে আলো তা কোমল হীরার ছটার মতোই আলোকময় করবে আমাদের জীবন।








