বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। দেশে মোট উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশ এই রুপালি ইলিশ দখল করে আছে। দেশের জিডিপি’তে ইলিশের অবদান এক শতাংশের বেশি। ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ-এর ভৌগোলিক নিবন্ধন (জিআই) দিয়েছে। বিশ্বে নিজস্ব পরিচয় সৃষ্টি করে সমাদর কুড়াচ্ছে বাংলাদেশের ইলিশ। গত কিছুদিন বাজারে প্রচুর ইলিশ থাকলেও হঠাৎ করে ভাটা তৈরি হয়েছে। সাগর উত্তাল থাকায় জেলেরা সাগরে যেতে না পারায় ইলিশ ধরা পড়ছে কম।
ইলিশ অধ্যুষিত জেলাগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষে ২৩ জুলাইয়ের পর থেকে ইলিশের ভরা মৌসুম শুরু হয়। জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়তে শুরু করেছিল প্রচুর পরিমাণে। সেই সময় বাজারেও বেড়েছিল ইলিশের সরবরাহ। নদীতে ও সাগরে এক থেকে দেড় কেজি ওজনের বেশি সাইজের ইলিশও ধরা পড়েছে প্রচুর। দামও নামতে শুরু করেছিল। কোরবানির আগে-পরে সপ্তাহখানেক এক কেজির বেশি বড় সাইজের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকা কেজি দরে। তবে বর্তমানে সাগর উত্তাল থাকায় জেলেরা সাগরে নামতে পারছেন না। ফলে ইলিশের সরবরাহ কমেছে অনেক। তাই দামও কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে বড় সাইজের (এক কেজির ওপরে) প্রতি কেজি ইলিশ বাজার ভেদে বিক্রি হচ্ছে ৯৫০ থেকে ১৬শ টাকা পর্যন্ত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তাল সাগরে এখন ইলিশ ধরা অনেকটাই বন্ধ রয়েছে। দেশের নদনদীতেও পানি বাড়ছে। দেশের ৩৩টি জেলা এখন বন্যা কবলিত। জেলেরা মাছ ধরার ট্রলার নিয়ে সাগর থেকে ফিরে নদীর মোহনায় অবস্থান করছেন। ঝুঁকি বেশি থাকায় তারা ট্রলার নিয়ে সাগরে যেতে চাইছেন না। তবে সাগরে ও নদীতে প্রচুর ইলিশ রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলেরা। সাগরের পরিবেশ কিছুটা শান্ত হলেই জেলেরা সাগরে ও নদীতে জাল ফেলবেন।
জানা গেছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এখন খালি পড়ে আছে। উপকূলে ফিরে এসেছেন কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলার প্রায় ছয় হাজারের অধিক মাছ ধরার ট্রলার। জেলেরা জানিয়েছেন, হঠাৎ সাগর উত্তাল ও বাতাস বেড়ে যাওয়ায় সাগরে মাছ শিকার না করে উপকূলে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন তারা। কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের জেটি ঘাটে নোঙর করা রয়েছে শত শত মাছ ধরার ট্রলার। এদের মধ্যে কেউ পাঁচ দিন আবার কেউ সাত দিন ধরে ট্রলারে বেকার সময় পার করছেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলে আব্দুর রহিম শেখ।
এদিকে বরগুনার বামনার জেলে মোখলেসুর রহমান জানিয়েছেন, নদীতে-সাগরে প্রচুর ইলিশ মাছ রয়েছে। আশা করছি এবছর গত বছরের তুলনায় বেশি পরিমাণে ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পড়বে। সাগর উত্তাল থাকায় এই মুহূর্তে ট্রলার নিয়ে আমরা সাগর মোহনায় নিরাপদ স্থানে সময় পার করছি। সাগর কিছুটা শান্ত হলেই ইলিশ ধরতে যাবো।
জানতে চাইলে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে কক্সবাজারকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। যার কারণে গত চার দিন ধরে কক্সবাজারে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত রয়েছে। আবহাওয়াজনিত কারণেই প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি আগামী আরও ৪-৫ দিন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছর দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার মেট্রিক টন, সেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ইলিশের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। ইলিশ ধরার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে ৫ লাখ জেলে পরিবার। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ইলিশের প্রজনন মৌসুমে সরকার প্রতিবছর ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এটি চালু হয়েছে ২০১৬ সাল থেকে। এর আগে ২০০৭ সালে এ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ছিল ১০ দিন। ২০১১ সালে ছিল ১১ দিন। এবং ২০১৫ সালে ছিল ১৫ দিন।
এদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম জানিয়েছেন, দি প্রটেকশন অ্যান্ড কনজার্ভেশন অব ফিস রুলস ১৯৮৫ সংশোধন করে ছয়টি ইলিশ অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জাটকা আহরণ নিষিদ্ধকালীন ২০টি জেলার ৯৬ উপজেলার জাটকা আহরণে বিরত থাকা ২ লাখ ৮০ হাজার ৯৬৩টি জেলে পরিবারকে বিতরণের জন্য প্রতি মাসে ৪০ কেজি হারে ৪৬ হাজার ৫৮০ দশমিক ৮ মেট্রিক টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। মা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময়েও ভিজিএফ চাল বিতরণ করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় ২০১৯ সালে ৩৫টি জেলার ১৪৭টি উপজেলার ৪ লাখ ৮ হাজার ৩২৯ টি পরিবারকে ২০ কেজি হারে মোট ৮ হাজার ১৬৬ দশমিক ৫৮ মেট্রিক টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। জাটকা সংরক্ষণ, অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা এবং ইলিশ প্রজনন সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে ২০২০ সালে ১৩টি জেলায় বিশেষ কম্বিং অপারেশন পরিচালনা করা হয়। ৩৮৭টি মোবাইল কোর্ট ও ১ হাজার ৫৫৪টি অভিযানের মাধ্যমে ২ হাজার ২৬৭টি ক্ষতিকর বেহুন্দী জাল, ৭ লাখ ১৬ হাজার ১৮৪ লাখ মিটার কারেন্ট জাল, ২ হাজার ৬৭টি অন্যান্য জাল আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৭ হাজার ৮৯ মেট্রিক টন জাটকা ও ২ হাজার ৩৭৯ মেট্রিক টন অন্যান্য মাছ জব্দ করা হয়েছে।








