সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও পাঁচ বছর সময়সীমা বেঁধে দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত ‘রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন-২০২০’ এ ২০২৫ সালের মধ্যে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। অবশ্য কোনও কোনও কমিশনার ওই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
বুধবার (২৬ আগস্ট) কমিশনের ৭০তম সভায় নতুন এ খসড়া উত্থাপন করা হলে কমিশনররা এসব মত দেন। সভায় প্রয়োজনীয় সংশোধন সাপেক্ষে খসড়া আইনটি নীতিগত অনুমোদন করা হয়। এর আগে ইসির প্রণীত খসড়া এ আইনে নারী নেতৃত্ব রাখার সময়সীমা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে নারী সংগঠনসহ অনেকে প্রতিবাদ করেছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ইসিতে দেওয়া মতামতে এ সময় পাঁচ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করছিল।
এদিকে নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) কিছু অংশ আলাদা করে নতুন ‘রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন’ প্রণয়ন নিয়ে কমিশন সভায় আপত্তি জানিয়েছেন দুজন কমিশনার। আরপিওতে এসব বিধান রেখেই প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। অন্য নির্বাচন কমিশনার নোট অব ডিসেন্ট না দিলেও নতুন আইন না করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপিও তাদের মতামতে নতুন আইন করার বিপক্ষে মত দিয়েছিল। এছাড়া সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নাম ও এর জনপ্রতিনিধিদের পদবি বদলের প্রস্তাবের বিপক্ষেও মত দিয়েছেন একাধিক নির্বাচন কমিশনার।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে বুধবার নির্বাচন ভবনে কমিশনের ৭০তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় চার কমিশনার, ইসির সিনিয়র সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। সভায় রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন, ২০২০ এর বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের জন্য তোলা হয়। সভার কার্যপত্রে বলা হয়, খসড়া আইনের উপর নিবন্ধিত ১৭টি রাজনৈতিক দল, ২৩টি অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠান এবং ১৫জন ব্যক্তি মতামত দিয়েছেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে এলডিপি ও খেলাফত মজলিস মতামত পাঠায়নি বলে ইসিতে চিঠি দিয়েছে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সিইসি আইনের খসড়া উত্থাপনের পর আইন সংস্কার কমিটির প্রধান হিসেবে কবিতা খানম তার মতামত তুলে ধরেন। তিনি রাজনৈতিক দল নিবন্ধনে নতুন আইন করার পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে প্রণীত আরপিওতে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের বিধান ছিল না। ২০০৮ সালে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন এটি পৃথক আইন করা হলে আরপিওর ব্যত্যয় ঘটবে না। রাজনৈতিক দলের কমিটিতে নারী নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠায় সময়সীমা বেধে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। এরপর বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী স্বতন্ত্র আইন তৈরিতে আপত্তি জানান। তিনি আরপিওতে এ সংক্রান্ত ধারায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার প্রস্তাব দেন। এছাড়া তিনি খসড়া আইনের দলের গঠনতন্ত্র, নাম ও সিলমোহরে রাষ্ট্রবিরোধী কিছু থাকতে পারবে না—এমন প্রস্তাবের প্রশ্ন তুলে বলেন, কোনটি রাষ্ট্রবিরোধী বা রাষ্ট্রের পক্ষের সেই সিদ্ধান্ত ইসি দিতে পারবে কিনা? নতুন আইন করতে হলে স্টেক হোল্ডারদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। এছাড়া জোটগত নির্বাচনে একটি দলের প্রতীকে আরেকটি দলের নির্বাচন করার বিধান সংশোধনী আনার প্রস্তাব দেন তিনি। জোটগত নির্বাচন করলেও স্ব স্ব দলীয় প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিধান যুক্তের প্রস্তাব দেন তিনি। তিনি নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার সময় ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করার প্রস্তাব দেন।
কমিশনার রফিকুল ইসলাম স্বতন্ত্র আইন করার পক্ষে প্রস্তাব দেন। তিনিও নারী নেতৃত্ব রাখার সময়সীমা বেধে দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
এদিকে বৈঠকে আলোচনার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার নোট ডিসেন্টে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন, ২০২০' -এর প্রারম্ভিক অংশে ‘সংক্ষিপ্ত শিরোনাম, প্রয়োগ ও প্রবর্তন ইত্যাদি পরিবর্তন বিষয়ে আমি একমত নই। এতে সঙ্গে পরিবর্তন করে নতুন যে পদ-পদবি প্রস্তাব করা হয়েছে তা আমার কাছে অনাবশ্যক মনে হয়। রাজনৈতিক দলসমূহ ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রাপ্ত মতামতে এসব পদ পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কি কারণে বা কোন যুক্তিতে এই পরিবর্তন প্রয়োজন, তা আমার বোধগম্য নয়। তবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আরপিও সংশোধন করা যেতে পারে।








