আশি ও নব্বই দশকের অনেকটা জুড়ে যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আবছা হতে শুরু করে, তখনই ১৯৯৬ সালের দিকে দেশজুড়ে সামনে আসে মুক্তিযুদ্ধের ডকুমেন্টেশন লিয়ার লেভিনের ফিতায় ধরে রাখা ১৯৭১ এর কথা ‘মুক্তির গান’। মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস শুনে বড় হতে থাকা প্রজন্ম প্রথমবারের মতো আসল ইতিহাসের টুকরো নিজ চোখে দেখার সুযোগ পায় তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের হাত ধরে। আর সেই ইতিহাস যিনি পাঠ করেন তিনিই জিয়াউদ্দিন তারিক আলী, যার মোটা ফ্রেমের চশমার ভেতরের চোখ দিয়ে দেখানো হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের চিত্র। আর ভরাট কণ্ঠের বিবরণে উঠে আসে পথে-প্রান্তরে মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রাম। জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর সেই মুক্তির গানের চেহারা অনেকেরই চেনা থাকলেও নিভৃতচারী মানুষটি এতদিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রক্ষার কাজটি দেশে বসেই করে যাচ্ছিলেন, তা ছিল অনেকের অজানা। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সামনে আসে সেই দিনগুলোর স্মৃতি, আর মানবিক সমাজ গড়ে তোলার সংগ্রামে আজীবন কাটিয়ে দেওয়া সেই মানুষটি।
তারিক আলীর নাম উচ্চারিত হলেই যে বিশেষণগুলো সামনে আসে তা হলো— সংগীতানুরাগী, রুচিশীল, মৃদুভাষী কিন্তু কর্মবীর মুক্তিযোদ্ধা। ভারতীয় গবেষক নয়নিকা মুখার্জি তাকে স্মরণ করতে গিয়ে মুক্তির গান প্রামান্যচিত্রে তার অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমি মানুষটিকে চিনি যখন থেকে বাংলাদেশ নিয়ে গবেষণা শুরু করি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করি তখন থেকেই। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে পরিচয় হওয়ার পরে তাকে চেনা শুরু হয়েছিল। বীরাঙ্গনাদের নিয়ে গ্রাফিক নোবেলের কাজ করতে গিয়ে তার সহযোগিতা পেয়েছি। তিনি কাজের মধ্যে মমত্ববোধ, সংবেদনশীলতা খুঁজে পাওয়ার কথা বলেছিলেন। এই তারিক আলী— যাকে মানুষ চিনতো, আবার চিনতো না। সেই মুক্তির গানের আবেগী একজন সংগ্রামী মানুষের ছবি যতটা চেনা ঋজু নিরলস কাজ করে যাওয়া ৭৫ এর তারিক ঠিক ততটাই অচেনা ছিলেন।’
১৯৯০ সালে নির্মাতা তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে দেখা হয় জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর। তিনি ছিলেন তারেক মাসুদের চাচাতো ভাই মাহমুদুর রহমান বেণুর বন্ধু। আর এই বেণুই ছিলেন একাত্তরে পথে প্রান্তরে, শরণার্থী শিবিরে শিল্পী দল নিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে গান শুনিয়ে মানুষকে জাগানোর শিল্পী দলের নেতা— যাদেরকে নিয়ে ধারণ করা ফুটেজ দিয়েই মূলত তৈরি হয়েছিল মুক্তির গান। আর এ প্রজন্মের কাছে সেই সময়টাকে তুলে ধরার মাধ্যম ছিলেন তারিক আলী। আমেরিকায় বসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চারণা করতে গিয়ে তারেক মাসুদের সামনে লিয়ার লেভিনের প্রসঙ্গ তোলেন। তাকে জানান এই ফুটেজগুলো তিনি লিয়ার লেভিনের বাসায় দেখেছেন। তারেক মাসুদ বেঁচে থাকতে দেওয়া অনেক সাক্ষাৎকারেই বলেছেন কীভাবে লিয়ারকে খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। এও বলেছিলেন তারেকের ফোন পেয়ে লিয়ার বলেছিলেন, ‘এই ফোনটির জন্যই তিনি এতে বছর হয়তো অপেক্ষা করছেন।’ এরপর ১৯৭১ সালে ধারণকৃত ফুটেজগুলো ধরে এগুতে থাকে নতুন ইতিহাস। তারিক আলীকে দিয়েই মুক্তির গানের ধারা ভাষ্য দেওয়ান তারেক মাসুদ। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তারিক আলী একবার এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘তখন এক ধরনের উন্মাদনা ছিল, আবার চারপাশে হাহাকার ছিল, আবার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল। আমার কণ্ঠে এসব ধরার ব্যাপার ছিল। কিন্তু যতটা বলা হয়, কণ্ঠ ততটা ভালো ছিল না। তবে ক্ষিপ্ত আবেগী এক তরুণের পুরু চশমার ভেতর দিয়ে দেখা নতুন দেশের জন্ম নেওয়াটা উঠে আসা জরুরি ছিল। তবে হ্যা, অত ভেবে কিছু করেছি তা বলা ঠিক হবে না।’
তার সেই কথার সূত্র ধরেই যেন মৃত্যু সংবাদ শুনে শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরাজ উদ্দীন হোসেনের সন্তান তৌহিদ রেজা নূর লিখেছেন, ‘মনে পড়ছে, বৃদ্ধ কৃষক সেই মুক্তিযোদ্ধার কথা। আমি কোনোদিন ভুলবো না গামছা মাথায় সেই স্বাধীনতার সৈনিককে— যাঁর সাহসিকতা ছিল কিংবদন্তীতুল্য। কোনোদিন ভুলবো না অকুতোভয় সেই বীর শহীদদের, যাঁরা প্রাণ দিয়েছিল বিজয় ছিনিয়ে আনতে। কিন্তু এই মহৎ আত্মদানের কথা মনে রাখাই কি যথেষ্ট? প্রশ্ন তবুও থেকে যায়। আমরা কি পারবো তাঁদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রাখতে? আমরা কি পারবো তাঁদের সেই মহান লক্ষ্যকে সমুন্নত রাখতে?’ এই প্রশ্ন চিরকালীন এবং এর উত্তর মেলাবার দায়িত্ব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আমাদের সবার। পঁচানব্বইয়ের সেই সন্ধ্যাতেই সেলুলয়েডের পাতা থেকে মোটা ফ্রেমের চশমাধারী সেই তরুণ হৃদয়ের গভীরে ঠাঁই নিয়েছিলেন। পরে পরিচিত হয়েছি তাঁর সঙ্গে, তিনি আরেক তারিক ভাই — জিয়াউদ্দীন তারিক আলী। প্রচারবিমুখ তারিক ভাইয়ের এই অনন্ত যাত্রায় চোখ এবং হৃদয় ভারী হয়ে উঠছে শুধুই। মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর আর দেখা হলো না তারিক ভাইয়ের। যেমন দেখা হবে না আমাদের সম্প্রতি ছেড়ে যাওয়া এদেশের আরও আারও সাহসী সন্তানদের।
দেশের মুক্তিকামী মানুষদের সংগঠিত করে গেছেন যে মানুষটাটি, আজীবন তিনি কেন এতটা নিভৃতচারী ছিলেন, জানতে চাইলে তার সহযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আরেক ট্রাস্টি ড. সারোয়ার আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত তিন দশক ধরে তিনি একটি সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি মনে করতেন স্বাধীনতার মর্মবাণী হচ্ছে– সব ধর্ম, সব প্রান্তিক জনগণের সমধিকার প্রতিষ্ঠা করা। যেকোনও জায়গায় সাম্প্রদায়িক হামলায় নির্যাতনের শিকার মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন তিনি। দেশের এমন কোনও প্রান্ত নেই, যে প্রান্তে তিনি যাননি। কিন্তু প্রচুর সাংবাদিক বন্ধু থাকার পরেও প্রচারবিমুখ থাকার কৌশল জানতেন তিনি। তারিক তার জীবন তার কর্মের চলনে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, দেশ গড়ার কাজ যার যার মতো করে আজীবন করে যেতে হয়। এ কাজে কোনও অবসর নেই, কোনও কর্মবিরতির সুযোগ নেই।








