রাজধানীর মিরপুরের জান্নাত আরা রচির তিন সন্তান। তার মধ্যে সবচেয়ে ছোট সন্তানের বয়স ২৭ মাস। নিয়ম অনুযায়ী ছোট সন্তানকে আজ তার ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়াতে যাবার কথা। কিন্তু জান্নাত যাননি। তিনি আজ সারাদিন অপেক্ষা করেছেন দেশজুড়ে শুরু হওয়া এই ক্যাম্পেইনের ফিডব্যাকের জন্য।
জান্নাত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত বছর এই ক্যাপসুল নিয়ে অনেক কিছু হলো, শেষ পর্যন্ত সেটা স্থগিত করে দেওয়া হলো। তাই আজই আমি যাই নি। তবে আত্মীয় বন্ধুদের অনেকেই গিয়েছে, তাদের কাছ থেকে শুনবো, গণমাধ্যমে এ নিয়ে খবর পড়বো, তারপর সন্তানকে ক্যাপসুল খাওয়াতে নেব।
তবে আশঙ্কা থেকে না হলেও শেখ সিরাজুম মুনীরা নীরা তার সন্তানকে ক্যাপসুল খাওয়াতে পারেননি না জানার কারণে। গণমাধ্যমকর্মী নীরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতি বছর এ ক্যাম্পেইন নিয়ে অনেক আগে থেকেই প্রচার করা হয় অনেক বেশি। কিন্তু এবারে করোনার কারণেই কিনা জানি না, আমার চোখে সেটা পড়েনি।
গত বছর স্থগিত হয়ে যাওয়া ক্যাপসুল ক্যাম্পেইনের কারণে এবারে সংশয় কাজ করেছে কিনা জানতে চাইলে নীরা বলেন, সংশয় কাজ করে না। এটুকু আস্থা সরকারের ওপর আছে।
সংশয় থাকলেও তিন বছর তিন মাসের সন্তান সুপ্রভা অরুন্ধতী তিতলিকে নিয়ে দুপুর দেড়টার দিকে কলাবাগানের অবস্থিত সূর্যের হাসি ক্লিনিকে যান ফারজানা আফরিন। তবে তার পরিচিত অনেকেই যাননি বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে করোনার কারণে শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসহ কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি কেমন হবে সে নিয়েও সংশয় ছিল অনেকের।
তিনি বলেন, গতবারের নানা ঘটনার কারণে কিছুটা সংশয় তো ছিলই, যার কারণে দেরি করে যাওয়া। আরও অভিভাবকরা দিচ্ছে কিনা সেটা দেখতে চাচ্ছিলাম, পরে অনেককে দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি দেওয়ার জন্য। আমি প্রতিবছর যে পরিমাণ অভিভাবক দেখি এবারে সেটা ছিল না, একেবারেই শূন্য ছিল।
অভিভাবকসহ চিকিৎসকরা বলছেন, কিছুটা আস্থাহীনতা, সংশয়, প্রচারের অভাবের মধ্যে দিয়ে এবারের ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে আস্থাহীনতা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ ছিল না, ছিল না প্রচার। কিন্তু করোনার কারণে যেটা এবারে অন্যান্য বারের চেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।
এ সংশয় কাটিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগের অভাব ছিল জানিয়ে ফারজানা বলেন, আবার প্রচারণাও অভাবটাও ছিল প্রকট। এ বছর যে কোনও সমস্যা নেই, কোনও ভয় ছাড়াই সন্তানকে ভিটামিন এ খাওয়ানো যাবে-এ ধরনের কিছুই চোখে পড়েনি।
তবে অভিভাবকদের এ কথার সঙ্গে একমত নন স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, যথেষ্ট উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে এবং করোনার এই সময়ে অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের নিয়ে এসেছেন।
প্রসঙ্গত, গত বছর সময় ঘোষণার এক সপ্তাহের মাথায় ১৯ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন স্থগিত করে মন্ত্রণালয়। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা, ক্যাপসুলের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাব, ক্যাপসুলে ছত্রাকের বিস্তার ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি— এই চার কারণ বিবেচনায় নিয়ে তখন ক্যাম্পেইনটি স্থগিত করা হয়।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘গতবছর ক্যাপসুলে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু সেটা আর ব্যবহার করা হয়নি। তার জন্য পরে আমরা একটি তদন্ত কমিটি করি এবং ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। কিন্তু এবারের ক্যাপসুলে কোনও সমস্যা নেই।’ কিন্তু এবারে অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি জানালে তিনি বলেন, আমরা তো প্রচার করেছি। তবে এটা ঠিক করোনার কারণে অনেক কিছুই পিছিয়ে গিয়েছে।
ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন ডা. আবু হোসেইন মোহাম্মদ মইনুল আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কোভিড সিচুয়েশনের মধ্যে এবারে ক্যাম্পেইন হচ্ছে। সারাদিনই আমি ফিল্ডে ছিলাম, ব্যাপক উৎসাহ দেখেছি। বরং আমিই ভয় পেয়েছিলাম মানুষ আসবে কিনা, কিন্তু আমরা সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে, অনেক অভিভাবক এসেছেন। ১৪ দিনের ক্যাম্পেইন চলবে, আরও ১৩ দিন আছে আশা করছি অভিভাবকরা আসবেন আরও। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুশি আজকের ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ দেখে।
তবে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের লাইন ডিরেক্টর ডা. এস এস এম মুস্তাফিজুর রহমান আস্থাহীনতার জন্য নয়, তিনি চিন্তিত ছিলেন কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে। চলতি বছর করোনা মহামারির কারণে গত জুনে এই ক্যাম্পেইন স্থগিত করা হয়। একইসঙ্গে সব শিশুকে এই ক্যাম্পেইনের আওতায় সম্ভব হবে কিনা সে বিষয়েও আশঙ্কা প্রকাশে করে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি ৯০ শতাংশ শিশুকে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানো সম্ভব হবে।’
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক ( স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করেছি। কয়েকটি সেন্টারে আমি নিজে গিয়েছে, সেখানে অভিভাবকরা মাস্ক পরে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই সন্তানদের নিয়ে এসেছে।








