সৌদি সরকারের নির্দেশনা মানতে হলে করোনাকালে দেশে আসা প্রবাসী কর্মীদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি সে দেশে আর পাঠানো সম্ভব হবে না বলে মনে করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা)। ঢাকায় সৌদি দূতাবাসের সার্কুলার অনুযায়ী একজন কর্মীকে ডকুমেন্টস তৈরি করে পুনরায় সব কার্যক্রম মেনে সৌদিতে পাঠানো ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ উল্লেখ করে বায়রার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ভাগ কর্মীর ক্ষেত্রে তাদের কর্মস্থলে যোগদান করা প্রায় অসম্ভব। এ প্রক্রিয়াকে সহজ করার জন্য জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
বুধবার (৮ অক্টোবর) সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বায়রার পক্ষে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলা হয়।
এদিকে বায়রার পক্ষ থেকে ২০১২ সালে প্রণীত মানবপাচার আইন বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য হয়রানিমূলক উল্লেখ করে তাদের ক্ষেত্রে ২০১৩ সালে প্রণয়ন করা অভিবাসন আইন দাবি করা হয়। এ বিষয়ে বায়রার সভাপতি বেনজির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যারা বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে থাকি, আমাদের কেউ মানবপাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। কিন্তু দেখা যায়, কোথাও কোনও ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করা হয়। এটা হয়রানিমূলক। এজন্য আমরা বলেছি, মানবপাচার আইনের পরিবর্তে আমাদের ক্ষেত্রে অভিবাসন আইনের বিধান প্রয়োগ করা হোক। আমাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে মন্ত্রণালয় একমত পোষণ করেছে এবং বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছে।’
বায়রার সভাপতি বেনজির আহমেদ এবং মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির কারণে যে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, তা কাটিয়ে উঠে শ্রমবাজারকে পুনরায় চালু করা বিশাল চ্যালেঞ্জের বিষয় হবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি প্লাটফর্মে কাজ করা অতি জরুরি প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি আন্তমন্ত্রণালয় কো-অর্ডিনেশন সেলের গঠনের প্রস্তাব করে বায়রার পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বায়রার প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করে এ সেল গঠন করা যেতে পারে। এই সেলে পূর্ববর্তী দক্ষতাসম্পন্ন অথবা সৌদি সরকারের উচ্চপর্যায়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ আছে—এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করে তা পরিচালনার জন্য একজন চিফ কো-অর্ডিনেটর নিয়োগ করা যেতে পারে।
কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলায় বায়রার সুপারিশে আরও বলা হয়, যেসব কর্মী ছুটিসহ বিভিন্ন কারণে দেশে আসার পর করোনা মহামারির কারণে কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারেননি, বা বর্তমানে যাদের ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়নি, যারা যাওয়ার চেষ্টা করছেন জরুরি ভিত্তিতে, তাদের একটি ডাটাবেজ প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
রিক্রুটিং এজেন্সির হাতে প্রক্রিয়াধীন প্রায় ৮৬ হাজার কর্মীর চাহিদা রয়েছে। তাদের কোভিড মহামারির কারণে প্রেরণ করা সম্ভব হয়নি। তাদের ৮০ শতাংশের বেশি কর্মীর ভিসার মেয়াদ ইতোমধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। নতুন প্রক্রিয়ায় ভিসা সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য। ঢাকায় সৌদি দূতাবাস এবং পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অতি দ্রুত যোগাযোগ ও আলোচনার মাধ্যমে এর সুরাহা করা প্রয়োজন।
প্রতারণা বা চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তদন্তের আগে রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রম বন্ধ না করার দাবি জানিয়ে বায়রার পক্ষ থেকে বলা হয়, সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পুরুষ ও নারী কর্মী পাঠানোর পরেও কখনও কখনও কর্মীর নিয়োগকর্তা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে থাকেন। আবার অনেক কর্মী বিদেশে গিয়ে হোমসিকসহ নানা কারণে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে এসেই তারা সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্টের নামে বিএমইটি কিংবা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দাখিল করেন। প্রবাসী কর্মীদের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রণালয় কিংবা বিএমইটি সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির সব কার্যকলাপ বন্ধ করে দেয়। একটি রিক্রুটিং এজেন্সির নামে অভিযোগ থাকতে পারে। অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত রিক্রুটিং এজেন্সির স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য অনুরোধ করছি। কারণ, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে দোষী সাব্যস্ত করা সমীচীন নয়। সংশ্লিষ্ট এজেন্সির কার্যক্রম বন্ধের কারণে প্রক্রিয়াধীন বিদেশগামী কর্মীদের বিড়ম্বনা ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কমিটিকে জানানো হয়, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এ বছর ২০৪টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে ১৬৩টি এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছিল।
বৈঠকে নিবন্ধিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বাইরে কেউ বিদেশগামী কর্মীদের সঙ্গে কোনও ধরনের লেনদেনে সম্পৃক্ত থাকলে, তাদের শাস্তির আওতায় আনার সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি। বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।
বৈঠকে জানানো হয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী শুধু বৈধ ও নিবন্ধিত অভিবাসী মৃত কর্মীর পরিবারকে ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নিয়ম থাকলেও বর্তমানে কোভিড মহামারি বিবেচনায় অবৈধ বা অনিবন্ধিত মৃত অভিবাসীর পরিবারকেও এ সহায়তা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশগামীদের সহায়তার জন্য ভিসার মেয়াদ বাড়ানো, বিমানের ফ্লাইট বাড়ানো, আর্থিক সহায়তা দেওয়াসহ নানামুখী পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানায় মন্ত্রণালয়। কর্মীদের বিদেশ যাওয়া আরও সহজ করতে আগামী বৈঠকে বাংলাদেশ বিমানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা করবে সংসদীয় কমিটি।
সভাপতি আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সভাপতিত্বে কমিটির সদস্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ, আলী আশরাফ ও সাদেক খান বৈঠকে অংশ নেন।








