কোয়ারেন্টিন ব্যর্থতা ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ বিপদ

জাকিয়া আহমেদ
২১ অক্টোবর ২০২০, ১১:০০আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২০, ১৭:২৪

করোনাভাইরাস

দেশে আশঙ্কাজনক হারে কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষের সংখ্যা কমছে। এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, কোয়ারেন্টিন ব্যর্থতার কারণে আক্রান্ত বাড়ছে। আর পুরো বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও মানুষকে কোয়ারেন্টিন না করতে পারার ব্যর্থতাকে ‘অ্যালার্মিং’ বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এমনিতেই সামনে শীতের মৌসুম। এ সময় রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি ঠিকমতো মানুষকে কোয়ারেন্টিন না করা যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ ভয়াবহ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা বিষয়ক তথ্য থেকে দেখা যায়, সোমবার (১৯ অক্টোবর) ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কোয়ারেন্টিনে ছিলেন মাত্র ৫৯৫ জন, তার আগের দিন (১৮ অক্টোবর) ছিলেন ৪৯২ জন, ১৭ অক্টোবর ৪২৮ জন, ১৬ অক্টোবর ৭৪৮ জন, ১৫ অক্টোবর ৮৩৬ জন, ১৪ অক্টোবর ৬৩৫ জন, ১৩ অক্টোবর ৭৯৮ জন, ১২ অক্টোবর ৬৬৪ জন।

এদিকে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সন্দেহভাজন আক্রান্তদের কোয়ারেন্টিনে রাখতে না পারার ব্যর্থতার সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সোমবার সংস্থাটির জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক পরিচালক ড. মাইকেল রায়ান বলেছেন, সামর্থ্য থাকলে তিনি প্রতিটি নিশ্চিত আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা সকলকে সঠিক মেয়াদে কোয়ারেন্টিনে রাখতেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সোমবার ডব্লিউএইচও’র জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক পরিচালক ড. মাইকেল রায়ান বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না, কোনও জায়গাতেই পদ্ধতিগতভাবে সেটি (কোয়ারেন্টিন করা) হয়েছে।’ আর সেটিই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে দেখার কারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ড. মাইকেল রায়ান জানান, ইউরোপীয় অঞ্চলে জাতিসংঘের স্বাস্থ্য সংস্থার ৪৮টি সদস্য দেশের মধ্যে অর্ধেকের বেশি দেশে গত এক সপ্তাহে আক্রান্ত বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। আর এই বৃদ্ধির সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর হার শনাক্ত করার কাজও শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিশ্বে করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৪ কোটি ৩ লাখ ৩৩ হাজার ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় সকাল নাগাদ করোনায় সংক্রমিত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৪ কোটি ৩ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৬ জন।

জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, একই সময় বিশ্বে করোনায় মোট মারা গেছে ১১ লাখ ১৭ হাজার ৪৩০ জন। এ তালিকায় প্রথম যুক্তরাষ্ট্র আর বাংলাদেশের অবস্থান ১৭তম।

বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম তিনজন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে জানায় সরকার, তার ১০ দিন পর প্রথম মৃত্যুর ঘোষণা আসে। দেশে এখন পর্যন্ত (১৯ অক্টোবর) করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৩৯ লাখ ২০৬ জন আর মারা গেছেন পাঁচ হাজার ৬৮১ জন। এখন পর্যন্ত শনাক্তের হার ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশ।

করোনাভাইরাসের মহামারির শুরু থেকে এর বিস্তার রোধে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ১৪ দিন পর্যন্ত আলাদা রাখা বা কোয়ারেন্টিনে পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে ডব্লিউএইচও। ভাইরাসটির কার্যকর ও স্বীকৃত কোনও প্রতিষেধক এখনও পাওয়া না যাওয়ায় সংক্রমণ ঠেকাতে এই প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়ে আসছে সংস্থাটি। তারপরও গত কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন দেশে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।

আমাদের দেশেও রোগীকে আইসোলেশন (বিচ্ছিন্নকরণ) এবং তার সংস্পর্শে আসাদের কোয়ারেন্টিন (সঙ্গ নিরোধ) করার জন্য বলা হলেও শুরু থেকেই সে নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সংশয় ছিল। করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুতে বিদেশফেরত যাত্রীদের হোম কোয়ারেন্টিন করার জন্য নির্দেশনা দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হলেও সেটা কতটুকু কার্যকর হয়েছে সে নিয়ে বারবার কথা বলেছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। কোনোভাবে হোম কোয়ারেন্টিন মানার মতো মানসিকতা আমাদের নেই বলেও জানিয়েছেন তারা।

প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন বাদ দিয়ে হোম কোয়ারেন্টিন করাটাই ছিল প্রথম ভুল মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এতে করে দিনকে দিন সংক্রমণ বেড়েছে, এতো সংক্রমণ হয়েছে। আর এখন তো মানুষ করোনাকে কিছু মনেই করে না। মানুষের ধৈর্য এত কম—কেমন করে সংক্রমণ এতে নিয়ন্ত্রণ হবে আমি তাই বুঝতে পারছি না। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের মানুষের ধৈর্য নাই, তারা অস্থির। আর এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের প্রতি পরামর্শ দিতে তিনি জাতীয় পরামর্শক কমিটির সভাপতির প্রতি একটি মিটিং ডাকার জন্যও আহ্বান করবেন বলে জানান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

আশঙ্কাজনক হারে কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষ কমছে মন্তব্য করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সম্প্রসারণ নীতিমালা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সামনে শীতের মৌসুম। এ সময়ে যদি মানুষকে কোয়ারেন্টিন করতে সমর্থ না হই তাহলে বিষয়টি অ্যালার্মিং।

তিনি বলেন, ইউরোপে ইতোমধ্যেই তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আমরা ভাবছি, এখন লাভবান হয়েছি, কিন্তু পরে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি—দুই ক্ষেত্রেই কঠিন অবস্থা হবে যদি শীতের সময়ে সাবধান না হই, মানুষকে কোয়ারেন্টিন না করা যায়।

তিনি বলেন, মানুষের আস্থা নাই। করোনার বিষয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এমন সব বার্তা পৌঁছেছে উচ্চ মহল থেকে, তাও প্রধানমন্ত্রী বলাতে একটু সাবধান হয়েছে। ‘আমাদের কোনও ভয় নাই, ভ্যাকসিন এলো বলে’—এসব কথায় মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, একইসঙ্গে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য যা করার দরকার ছিল—জনসম্পৃক্ততা ছিল না। স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ইমাম, জনপ্রতিনিধি, চিকিৎসক, সাংবাদিক—সবাইকে নিয়ে জনসম্পৃক্ততাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি—এটা হচ্ছে প্রধান বিষয়। আর বাসায় কোয়ারেন্টিন করার ক্ষমতা যাদের নাই, তাদের জন্য কিছু ব্যবস্থা করা, সেটাও করা হয়নি। স্কুলগুলো বন্ধ। সেখানে মানুষকে রাখা যেতো। কিন্তু উদ্যোগ কমে গেছে আসলে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর উপদেষ্টা ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিদেশফেরত যাত্রীদের কোয়ারেন্টিন করা হচ্ছে প্রধানত, দেশের ভেতরে কোয়ারেন্টিন করা হচ্ছে বলে আমি জানি না। কিন্তু প্রতিজন কনফার্ম রোগীদের কন্টাক্টে যারা ছিলেন, পরিবারের সদস্য, অফিসের সহকর্মীসহ যারাই সংস্পর্শে এসেছেন তাদের প্রত্যেককেই কোয়ারেন্টিন করার কথা নিয়ম অনুযায়ী। সেটা হতে পারে ঘরে অথবা সরকারি প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের হয়তো হিসাব আছে কিন্তু ঘরে আদৌ কোয়ারেন্টিন হয় কিনা—সেটা হচ্ছে কথা।

কেবল কোভিড আক্রান্ত রোগীর কন্টাক্টে থাকাদের নয়, এখন যারা জ্বরের রোগী তাদেরকে অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন করতে হবে। শুধু কোভিড আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে আসাদের কোয়ারেন্টিন করলেই হবে না। রোগীদেরই তো আইসোলেশন করার কোনও হিসাব নাই, হাসপাতালে সবাই যাচ্ছে না।

প্রতিদিন হাজারের ওপরে যেসব রোগীর শনাক্ত হচ্ছেন তারা কোথায় থাকে, এগুলো বড় প্রশ্ন। এক রোগীকে আইসোলেশন করেও যদি তার কন্টাকে আসা দুজনকে কোয়ারেন্টিন করা হয় তাহলে নিদেনপক্ষে ২০ হাজার মানুষ কোয়ারেন্টিনে থাকবেন—তারা কোথায়, প্রশ্ন করেন ডা. মুশতাক হোসেন।

‘কোয়ারেন্টিনের যে সংখ্যা দেওয়া হচ্ছে সেটা গ্রহণযোগ্য সংখ্যা নয়’

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, প্রতিটি শনাক্ত রোগীকে আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে এবং তার কন্টাক্টের সন্দেহে যারা রয়েছেন তাদেরকে কোয়ারেন্টিন করতে হবে—এটা সরকারি উদ্যোগে জাতীয় ভিত্তিতে করতে হবে। সাধারণ মানুষের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। গত কয়েক মাস ধরেই যে ঢিলেঢালা অবস্থা চলছে এখনও যদি সেভাবে চলতে থাকে তাহলে খুব খারাপ হবে অবস্থা।

 

/এমআর/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
নতুন আইফোন আসতেই পুরোনো মডেলের দাম বাড়ালো অ্যাপল
নতুন আইফোন আসতেই পুরোনো মডেলের দাম বাড়ালো অ্যাপল
খুলনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, ২ কর্মী আটক
খুলনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, ২ কর্মী আটক
২৫ বছর পরও মার্কিন নাগরিকদের মনে অমলিন নাইন-ইলেভেন
২৫ বছর পরও মার্কিন নাগরিকদের মনে অমলিন নাইন-ইলেভেন
মালয়েশিয়ার নাইট মার্কেট: রাতের শহরে কেনাকাটা ও খাবারের স্বাদ
মালয়েশিয়ার নাইট মার্কেট: রাতের শহরে কেনাকাটা ও খাবারের স্বাদ
সর্বাধিক পঠিত
কানাডায় ববিতার ৩৬ ঘণ্টার সড়ক ভ্রমণ, সঙ্গে ছিলেন রাজ্জাকের ছেলে
কানাডায় ববিতার ৩৬ ঘণ্টার সড়ক ভ্রমণ, সঙ্গে ছিলেন রাজ্জাকের ছেলে
এখন সুযোগ পেলে কাকে নায়িকা হিসেবে চান আলমগীর, জানালেন নিজেই
এখন সুযোগ পেলে কাকে নায়িকা হিসেবে চান আলমগীর, জানালেন নিজেই
এক ভবন থেকে ৭০ বিদেশি নাগরিক আটক, কী করছিলেন তারা
এক ভবন থেকে ৭০ বিদেশি নাগরিক আটক, কী করছিলেন তারা
দৌলতদিয়ায় আতঙ্ক, কেন মারা যাচ্ছেন যৌনকর্মীরা? 
দৌলতদিয়ায় আতঙ্ক, কেন মারা যাচ্ছেন যৌনকর্মীরা? 
বাংলাদেশ দল থেকে দুই প্রবাসীসহ ৬ জন বাদ
বাংলাদেশ দল থেকে দুই প্রবাসীসহ ৬ জন বাদ