স্বাস্থ্যের ইনোভেশনে স্বাস্থ্যের লোক নেই!

জাকিয়া আহমেদ
৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৮:৪৪আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১২:০৩

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যে প্রশাসন ক্যাডারের পদায়ন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চিকিৎসকদের ক্ষোভের ভেতরেই জানা গেলো মন্ত্রণালয়ে গঠিত হওয়া স্বাস্থ্যের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য গঠিত ইনোভেশন টিমে নেই চিকিৎসক বা গুণগত মান বৃদ্ধির করার জন্য টেকনিক্যাল কোনও ব্যক্তি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন ধরনের ইনোভেশন বা গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সময়ে কাজ করা হয়েছে। কিন্তু এই ইনোভেশন টিমে না আছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা সে সম্পর্কে জানা চিকিৎসক, না আছেন অধিদফতরের কেউ। অথচ চিকিৎসা বিদ্যার মতো সূক্ষ্ম বিষয়ে কেবল আমলা দিয়ে সম্ভব নয়।

গত ২০ অক্টোবর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপ-সচিব উর্মি তামান্না স্বাক্ষরিত এক ‘অফিস আদেশ’ জারি হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে ২০১৩ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনের আলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ইনোভেশন টিম গঠন করা হয়। ইনোভেশন টিমের কাজের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০২০-২০২১ অর্থবছরের ইনোভেশন টিমের কমিটি পুনর্গঠন করা হলো।

১৫ সদস্যের ইনোভেশন টিমে আহ্বায়ক করা হয়েছে অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) আর সদস্য সচিব উপ-সচিবকে ( প্রশাসন-৪)। বাকিরা হলেন, অতিরিক্ত সচিব ( ওষুধ প্রশাসন), যুগ্ম সচিব (প্রশাসন), যুগ্ম সচিব (বাজেট), যুগ্ম সচিব ( মানবসম্পদ), যুগ্ম সচিব ( পার), যুগ্ম সচিব (স্বাস্থ্য), উপ-সচিব ( ক্রয় ও সংগ্রহ-১), উপ-সচিব ( প্রশাসন-৩), উপ-সচিব ( প্রশাসন-২), উপ-সচিব ( সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-১), উপ-সচিব ( নার্সিং সেবা-১), উপ-সচিব ( জনস্বাস্থ্য-২) এবং সিস্টেম এনালিস্ট ।

ইনোভেশন টিমের পাঁচটি কার্যপরিধিতে লেখা রয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সেবা প্রদান প্রক্রিয়া এবং কাজের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার গুণগত পরিবর্তন আনয়ন; উদ্ভাবনী প্রস্তাব বিষয়ে পরিবর্তনের বাৎসরিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বছরের শুরুতে অনুমোদন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন; নিয়মিত টিমের সভা অনুষ্ঠান, কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন, অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং মাসিক সভায় উপস্থাপন; অধিদফতর/দফতর/ সংস্থা পর্যায়ে গঠিত সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ইনোভেশন টিমের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধন এবং প্রতিবছর ৩০ জুনের মধ্যে পূর্ববর্তী অর্থবছরের একটি পূর্ণাঙ্গ বাৎসরিক প্রতিবেদন এবং ইনোভেশন ডকুমেন্ট প্রণয়ন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ।

চিকিৎসকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ( বিএমএ)। এ সংগঠনের মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইনোভেশনের টিমের উদ্দেশ্য বর্তমানে এ সেক্টরে যে চিত্র বা কর্মপদ্ধতি রয়েছে তাকে কীভাবে আরও আপগ্রেড করা বা তার গুনগত মানের উন্নয়ন করা। কিন্তু সেটা করতে হলে সে বিভাগের কাজের গতি-প্রকৃতি জানতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ইনোভেশন কোথায় হতে পারে সে সম্পর্কে উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এমন অনেক রোগী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসেন, যাদের এই হাসপাতালে আসার কথা না, অনেক রোগী বিছানা ছাড়া মেঝেতে শুয়ে আছেন, অনেক রোগীর অস্ত্রোপচারের সময় পড়ছে এক থেকে দেড় মাস পরে। এসব বিষয়ের মতো স্বাস্থ্যসেবা খাতে উন্নতি করতে হলে হাসপাতালে যারা কাজ করছেন, যারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তারা বলতে পারবেন কীভাবে রোগীকে মাটিতে না রেখে বিছানায় রাখা যায়, তারাই বলতে পারবেন কী পদ্ধতিতে রোগীদের অস্ত্রোপচারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না—এসবই গুণগত মান বৃদ্ধির অংশ, আর এসবের জন্যই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের টেকনিক্যাল মানুষের প্রয়োজন।

এই চিকিৎসক নেতা বলেন, একটি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় দৈনন্দিন কী কী কাজ হয়, মানুষের কোথায় ভোগান্তি বা কোথায় হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা, হাসপাতালে স্ট্রাকচার, প্রসেসকে সহজ করা, সহজ কার্যপদ্ধতি, সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে স্বাস্থ্যসেবার এই ইনোভেশন টিমের একজনও ওয়াকিবহাল নয়। তারা কীভাবে করবে, কী ইনোভেশন করবে- এটা আমি বুঝতে পারছি না। আমি অবাক হলাম, এই কমিটি দেখে।

তিনি বলেন, কমিটির কার্যপরিধির প্রথম কথাই হচ্ছে, সেবা বিভাগের সেবা প্রদান প্রক্রিয়া এবং কাজের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার গুণগত পরিবর্তন আনয়ন। এখানে চিকিৎসক থাকবেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা থাকবেন যারা এই সেবা প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। কমিটিতে একজনও চিকিৎসক বা এ সম্পর্কে জানেন এমন কেউ নেই। তাদের কী জ্ঞান রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে? তারা তো কিছু জানেই না সেবা প্রদান প্রক্রিয়া সম্পর্কে, তাহলে তারা কী পরামর্শ দিয়ে কীসের মান বাড়াবেন? মন্ত্রণালয়ের ১৫ জন আমলা বা প্রশাসনিক মানুষদের নিয়ে কমিটি করা হলো, তারা স্বাস্থ্যসেবা প্রদান-প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনও জ্ঞানই রাখেন না এবং সেই সেবার গুণগত মান উন্নত করার জন্য তারা কী চিন্তা করবেন? “স্বাস্থ্যের দুর্গম রাস্তা জানেন এই খাতের মানুষরা। মন্ত্রণালয়ের মানুষ সেটা কীভাবে জানতে পারবে, এটা আমি বুঝে উঠতে পারছি না।

তিনি আরও বলেন, টেকনিক্যাল বিষয়ে নন-টেকনিক্যাল মানুষ কিছু করতে পারবে না, পরামর্শ দেওয়া কষ্টকর, দুরূহ এবং বেশিরভাগ সময়ই সেটা সঠিক হয় না—এইজন্যই আমরা দাবি তুলেছি এ বিষয়ে। এতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের রাখতে হবে। যাতে করে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হয়। কিন্তু কমিটিতে সবাই নন-টেকনিক্যাল, তাতে করে ভালো হবার চেয়ে খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, রোগীদের ভোগান্তি বাড়বে এতে।

সরকার যে কারণে ইনোভেশন প্রক্রিয়া, আরও আধুনিক, আরও যুগোপযোগী, সময়োপযোগী, রোগীদের জন্য সহজলভ্য করতে চায়- সে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রাতে পৌঁছানো যাবে না, এ উদ্দেশ্য সফল হবে না, বরং ব্যাহত হবে—বলেন ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ ( স্বাচিপ)-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এটা চিকিৎসা সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেবা বিভাগের কোথায় ত্রুটি এবং সে ত্রুটিগুলো উত্তরণ করা সম্ভব কীভাবে—এগুলো কেবল সেবা বিভাগের সঙ্গে বর্তমানে সম্পৃক্ত এবং যারা অতীতে সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের পক্ষেই নির্ধারণ করা সম্ভব, অন্য কারও পক্ষে নয়। যে সমস্যা জানে সেই সমাধান করতে পারবে, যে সমস্যাই জানে না—সে কীভাবে সমাধান করবে? প্রশ্ন অধ্যাপক ইকবাল আর্সলানের।

তিনি বলেন, আমাকে যদি অর্থনীতির কোনও বিষয়ে কাজে দেওয়া হয় সেটা হবে নির্বুদ্ধিতা, ঠিক একইভাবে স্বাস্থ্যসেবার অভ্যন্তরে উন্নয়নের জন্য দরকার এই সেবার উন্নয়নে কী কী সমস্যা বাধা-এবং সেই বাধা উত্তরণের জন্য কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন-এটা শুধুমাত্র এই পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষ যত ভালো বোঝে, এই পেশার বাইরে যে যত বড় জ্ঞানীই হোক-তার পক্ষে বোঝা সম্ভব না।

এগুলো যে কোনও রাষ্ট্র বা সমাজের জন্য দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্য করে অধ্যাপক আর্সলান বলেন, সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় দেওয়া, সঠিক মানুষকে সঠিক দায়িত্ব প্রদান করা—এগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত না হবে ততক্ষণ রাষ্ট্রের গুণগত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। একইসঙ্গে যারা এই কাজগুলো করছে...এগুলো মেধার অভাব তাদের আসলে মৌলিক জ্ঞানের অভাব, তা না হলে এই কাজ কেউ করতে পারে না।

তবে ইনোভেশন টিমের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকেই এটা করা হয়েছে অথচ আপনি জানেন না—প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, হয়তো করতে পারে, সচিব করছে, আমার মনে পড়ে না এরকম কিছু আরকি।

তারা কী ইনোভেট করবে তাইতো বুঝলাম না মন্তব্য করে স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যার যে বিদ্যা নেই, যে বিদ্যা সে জানেই না, বোঝেই না, সে ইনোভেশন কী করবে?

যদি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ব্যাপার হয়, তার ইনোভেশনের সক্ষমতা তাদের নেই। এটা সূক্ষ্ম একটা পেশা, পেশাগত বিশেষ ব্যাপার-সেগুলো সূক্ষ্মভাবে বোঝার ক্ষমতা তাদের নেই।

এ বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য সচিব আব্দুল মান্নানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

/এমআর/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী