(বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকারি কর্মকাণ্ড ও তার শাসনামল নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে বাংলা ট্রিবিউন। আজ পড়ুন ওই বছরের ৭ ডিসেম্বরের ঘটনা।)
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির বিষয়টি বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের তৃতীয় সম্মেলনে আলোচনা করা অপরিহার্য। পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিলে যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে লোকসভায় বিতর্কের উদ্বোধনী ভাষণে সরদার শরণ সিং এ মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, সিমলা চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করায় এই উপমহাদেশের শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৭২ সালের ২৯ নভেম্বর ভারতীয় পার্লামেন্টে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান আবু সাঈদ চৌধুরী জানান, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেওয়া হবে কিনা সে বিষয়ে ত্রিপক্ষীয় সম্মেলনে স্থির করা হবে। লোকসভায় বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করা হয়। লোকসভায় বলা হয়, সিমলা চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তিদানের জন্য আলোচনা শুরু করা হবে। কিন্তু ভারত পাকিস্তানকে জানিয়ে দেয় যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশের মতামত প্রয়োজন হবে। সুতরাং পাকিস্তান যতদিন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেবে ততদিন পর্যন্ত সিমলা চুক্তি অনুযায়ী বৈঠকের কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত কোনও আলোচনা চলবে না।
সিমলা চুক্তির ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণরেখা
এদিকে ভারতের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এস এইচ এফ জে মানেকশ এবং পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল টিক্কা খান লাহোরে তাদের দ্বিতীয় দফা বৈঠকে জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণরেখা চিহ্নিতকরণের অন্তরাল সৃষ্টিকারী থাকোচক সমস্যাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেন। বৈঠক শেষ হওয়ার পর লাহোর অধীনে প্রকাশিত যুক্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুই দেশের সেনাপ্রধান যেসব মতপার্থক্য ছিল সেগুলো নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়েছেন এবং এক পদস্থ সামরিক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল পি এস ভগতেনদ ও লে জে আবদুল হামিদ খানকে আগামীতে বৈঠকে মিলিত হয়ে তাদের ঠিক করে দেওয়া ব্যবস্থা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
শিল্প বিক্রির সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সরকার পূর্বে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ে নিয়েছিল তার মধ্যে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই কর্মসূচির অধীন শিল্প প্রতিষ্ঠার যেগুলোর সম্পত্তির মূল্য ১৫ লাখ টাকার নিচে ছিল সেগুলো বিক্রি করা হবে। ১৯৭২ সালের এইদিনে সরকারি এক হ্যান্ডআউটে এ তথ্য জানানো হয়। এ ব্যাপারে শ্রমিক সমবায় সমিতি অগ্রাধিকার পাবে উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি জানিয়ে দেওয়া হয়।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে খাদ্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে খাদ্যদ্রব্যের সরবরাহ ও মূল্যসহ দেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ওই সভায় ইতিপূর্বে গৃহীত কতিপয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আলোচনা করা হয় বলে জানা যায়। বৈঠকটি দেড়ঘণ্টা স্থায়ী হয়।
এদিকে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন জাহাজ ও বিমান চলাচল দফতরের মন্ত্রীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী এবং পূর্তমন্ত্রী মতিউর রহমান এইদিনে সাভারে স্বাধীনতা সংগ্রামে নিহত লক্ষ লক্ষ শহীদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মরণে নির্মাণাধীন স্মৃতিসৌধের জন্য নির্দিষ্ট স্থান পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে সাভারে সুপরিকল্পিত জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এই জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় হবে। অন্যান্য জিনিসের মধ্যে ১৫০ ফুট উচ্চতা সৌধ, অনির্বাণ শিখা, একটি জাদুঘর, একটি পাঠাগার, সমাধি, বাগান থাকবে। এ জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ আগামী বছর শেষ হবে বলেও জানানো হয়।








