বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার পরিবারে যেটুকু সময় দিতে পারতেন সেই সময়টি তিনি কখনও সন্তান, কখনও পিতা, কখনও প্রিয়তম স্বামী। জন্মদিনগুলোতে পুরো দেশের মানুষ যেমন উচ্ছ্বাস নিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাতে আসতো তেমনি পরিবারের সদস্যরা সারাদিন অপেক্ষা করতেন কখন শেখ মুজিব বাসায় ফিরে সময় দিতে পারবেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালে জন্মদিনগুলোর পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে আঁচ পাওয়া যায় পরিবারের সঙ্গে তার বন্ধনের।
জন্মদিনে খোকাকে আমি কী দেবো?
১৯৭৩ সালে জন্মদিনে ‘খোকাকে আমি কী দেবো?’ প্রশ্ন করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর বৃদ্ধ জননী। তার পুত্রবধূ বেগম মুজিব সশ্রদ্ধ কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন ‘আপনি আপনার খোকাকে দোয়া করুন আম্মা, অন্তরের দোয়া’। তিনি বলেন, আমি সব সময় দোয়া করি। দেশের বাড়িতে ওরা ওদের বঙ্গবন্ধুর মাকে দেখতে আসে, বুকটা আমার ভরে যায়। জন্মদিনে আজ ওরে দোয়া করেছি তবুও মনটাতে কিছু একটা দিতে ইচ্ছে করে, বলেছিলেন গর্বিত জননী।
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে সুবেহ সাদিকের আবছা আলোয় বাগান থেকে তাজা ফুল তুলেছিল রেহানা। হাসি মুখে তুলে দিয়েছিলেন আব্বুর হাতে। জনতা এসেছিল ফুলের মালা নিয়ে, কণ্ঠে প্রিয় নেতার উদ্দেশে গগনবিদারী ধ্বনি আর কারও কারও হাতে ছিল মিষ্টি খাবার, বড় বড় কেক। বিশাল আকৃতির বার্থডে কেক সামনে রেখে অপেক্ষা করছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সদস্যরা। বিদেশি অনুকরণে জন্মদিন উদযাপন বঙ্গবন্ধু পছন্দ করেন না। তবুও বন্ধুদের অনুরোধে হাত দিয়ে এক টুকরো তুলে নেন। ভেতর থেকে চারটা শান্তির পায়রা উড়ে যায় আকাশে। বঙ্গবন্ধু জন্মদিন উপলক্ষে তার প্রিয়জনেরা সকলেই সমবেত হয়েছিলেন ধানমন্ডির বাসায়। মনের মতো রান্না করে এনেছিলেন ভাইয়ের জন্য। সবাই মিলে প্রিয় খাবার মাটিতে মাদুর বিছিয়ে একসঙ্গে খেতে বসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সামনে বসেছিলেন বৃদ্ধা জননী। মাত্র কয়েক মুহূর্ত বঙ্গবন্ধু ক্ষণিকের জন্য ফিরে যেতে পেরেছিলেন অতীতের সেই সোনালী দিনগুলোয়।
বিকেল পাঁচটা। বঙ্গবন্ধুকে শিশু জয় (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তান) স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল সকাল-সকাল ঘরে ফেরার কথা। আলাদা করে বলা শব্দগুলো বোঝা যাচ্ছিল না। বঙ্গবন্ধু কিন্তু হাসিমুখে কথা বলছিলেন। বেলা শেষ হয়, রাতের চাঁদটা সেদিন ভরে গেছে কিন্তু চাঁদের দিকে চেয়ে জয় ভাবছে দাদুর ফিরে আসার কথা। কাজ সেরে দাদু কখন ফিরবেন!
ছেলের জন্য দোয়া করলেন বঙ্গবন্ধুর বাবা
বাংলার মানুষ যেন সুখী হয় আপনি দোয়া করুন বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই দিনে ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫৩তম জন্মবার্ষিকী। এদিন তিনি পিজি হাসপাতালে অসুস্থ পিতাকে দেখতে যান। তখন তিনি তার পিতা শেখ লুৎফর রহমানের কাছে এই দোয়া কামনা করেন। বঙ্গবন্ধুর বাবা ৯৩ বছর বয়সী শেখ লুৎফর রহমান পিজি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ছেলেকে কাছে পেয়ে তার দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া করতে থাকলেন। বঙ্গবন্ধু তার কাছে এই দোয়া কামনা করেন যে, বাংলার মানুষকে তিনি যেন সুখী দেখে মরতে পারেন। বাংলার মানুষ যেন সুখী হয়।
শেখ লুৎফর রহমান ছেলের এই ঐকান্তিক বাসনার জবাবে বলেন, তুমি যাতে বাংলার মানুষের সেবা করতে পারো সেই দোয়া চিরদিন করেছি। তিনি ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেন, পাকিস্তানের কারাগারে বছরের পর বছর কাটিয়ে তোমার মাথার চুল সাদা হয়ে গেছে প্রত্যুত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমার বয়স ৫৩।









