ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই!

জাকিয়া আহমেদ
২২ মার্চ ২০২১, ২২:২১আপডেট : ২২ মার্চ ২০২১, ২৩:০২

গত শনিবার (২০ মার্চ) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হতে আসেন করোনায় আক্রান্ত এক দম্পতি। কিন্তু বেড না থাকায় তারা ঢামেকের শিশু সার্জারি বিভাগের ডাক্তার অধ্যাপক ডা. আব্দুল হানিফ টাবলুর রেফারেন্স দেন। এরপর করোনা ইউনিটে দায়িত্বরত চিকিৎসককে ফোন করে ডা. আব্দুল হানিফ জানতে পারেন, সেখানে বেড ফাঁকা নেই।

ডা. আব্দুল হানিফ টাবলু বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এরপর তিনি ফোন করেন মুগদা জেনারেল হাসপাতালে। সেখানেও ফাঁকা ছিল না কোনও বেড।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, দুই সপ্তাহ আগেও করোনা রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিলেন ৯৮ জন। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ৩৯৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা বিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে (সোমবার, ২২ মার্চ) দেখা যায় এই হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য বেড রয়েছে ২৭৫টি আর রোগী ভর্তি আছেন ৩৯৩ জন।

সোমবার (২২ মার্চ) সকাল নয়টা পর্যন্ত রোগী ছিলেন ৪০৭ জন। রোগীদের কেবিন শেয়ার করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বলেও জানায় হাসপাতালের একটি সূত্র।

চিকিৎসকরা বলছেন, গত বছর মে-জুন-জুলাইয়ের দিকে যেমনটা হয়েছিল সেটা এ বছর মার্চে হচ্ছে। প্রথমেই সবগুলো সরকারি আইসিইউ বেড পূর্ণ হয়ে গেল। সাধারণ বেডও খালি নেই। অথচ কারও মধ্যে একটু সতর্কতাও চোখে পড়ছে না। করোনার এই ঊর্ধ্বগতি কতটা ভয়ংকর হতে যাচ্ছে সেটা বোঝা যায় এই বেড সংকট দেখলেই।

বেসরকারি আজগর আলী হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ তন্ময় কুমার সাহা জানিয়েছেন, তার হাসপাতালের দুই ফ্লোরে ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি রোগী ভর্তি। তিনি তার সহকর্মী, আত্মীয় ও পরিচিতদেরও ভর্তি করাতে পারছে না। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অগ্রিম বেড বুকিং দিচ্ছেন।

বেসরকারি গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রাশেদুল হাসান কনক বলেন, এবার আইসিইউ নয়, সাধারণ বেড নিয়ে হাহাকার শুরু হয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন আসছে। কিন্তু বেড ফাঁকা না থাকলে ভর্তি কিভাবে দেবো?

বেসরকারি এএমজেড হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, ওয়ার্ড, কেবিন আইসিইউ—কোনওটাই খালি নেই। বেডের অভাবে রোগীদের ফেরত দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

করোনায় আক্রান্ত ৫০ বছরের একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। স্কয়ার, আসগর আলি, এভারকেয়ার, ইউনাইটেড, ল্যাবএইড, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড, এএমজেড—পরপর সাতটি হাসপাতাল খোঁজ নিয়ে জানলেন, ‘সিট খালি নেই।’

৭ মার্চের পর থেকেই করোনার পরিস্থিতি খারাপের দিকে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ইউকে ভ্যারিয়েন্ট এসেছে। এই ভ্যারিয়েন্ট ৭০ শতাংশ দ্রুত ছড়ায়। চিকিৎসকরা বলছেন, যেহেতু বেশি মানুষ সংক্রমিত হবে, সেই অনুযায়ী আইসিইউ বা অক্সিজেন প্রয়োজন।

২০ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে শনাক্ত বেড়েছে ৯১ শতাংশ। গত সপ্তাহের তুলনায় চলতি সপ্তাহে শনাক্তের হার বেড়েছে ৯১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সেদিন, অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত সপ্তাহের (৭-১৩ মার্চ) তুলনায় চলতি সপ্তাহে (১৪-২০ মার্চ) রোগী শনাক্তের হার বেড়েছে ৯১ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

সেদিন অধিদফতর আরও জানায়, তার আগের সপ্তাহের তুলনায় (৭-১৩ মার্চ) চলতি সপ্তাহে ( ১৪-২০ মার্চ) করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বেড়েছে ৮৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আগের সপ্তাহে মারা গিয়েছেন ৭৬ জন। চলতি সপ্তাহে মারা গেছেন ১৪১ জন।

করোনার এ ঊর্ধ্বগতির জন্য ইউকে ভ্যারিয়েন্টের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মানাও অন্যতম কারণ বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

তিনি বলেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য ইউকে ভ্যারিয়েন্ট যতটা না দায়ী, তারচেয়ে বেশি দায়ী আমাদের জীবনাচরণ। তবে অবশ্যই ইউকে ভ্যারিয়েন্টের প্রভাব বেশি।

‘এই মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া চলাচল সীমিত রেখে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি’—বলেন অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা।

সংক্রমণ বাড়ার কারণ হিসেবে বাংলা ট্রিবিউনকে একই কারণ জানিয়েছেন অণুজীব বিজ্ঞানী ড. সমীর সাহা। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য ইউকে ভ্যারিয়েন্টের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মানাও দায়ী।

সংক্রমণ রোধে মাস্ক ছাড়া গতি নেই জানিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মাস্ক ছাড়া গতি নেই। একইসঙ্গে সামাজিক দূরত্ব এবং ঘন ঘন হাত ধোয়ার যে অভ্যাস হয়েছিল সেখান থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।

এদিকে হাসপাতালে বেড না পাওয়া এবং ভোগান্তি এড়াতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতি বিশেষ অনুরোধ করে ঢামেকের ডা. আব্দুল হানিফ টাবলু বলেন, ‘হাসপাতালের বেড বাড়ানোর পাশাপাশি কোথায় গেলে বেড খালি পাওয়া যাবে—তা যদি টেলিভিশনের স্ক্রলে বা অন্য গণমাধ্যমে জনগণকে জানানো যায়, তবে ভোগান্তি যেমন কমবে, তেমনি দ্রুত চিকিৎসা দেওয়াও সম্ভব হবে।

এই পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মিরপুরের লালকুঠিসহ অন্য যেসব হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সেগুলো আবার চালু করা হচ্ছে।

/এমআর/এফএ
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম