হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ভাইবার, ইমো, লাইন, সিগন্যালের মতো প্রচলিত ওটিটি (ওভার দ্য টপ) অ্যাপসের কারণে সরকারের বছরে রাজস্ব ক্ষতি প্রায় ১ হাজার ১৮ কোটি টাকা। বড় ক্ষতি হয় মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর। শুধু মোবাইল অপারেটরগুলোকে বাঁচাতে দেশি উদ্যোক্তাদের ওটিটির জন্য কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ওটিটি সার্ভিসের জন্য রেগুলেশন প্রস্তুত না হওয়ায় অপারেটরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন আবেদনকারীকে অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দেশে ওটিটি সেবা দেয় আইপিটিএসপি অপারেটররা। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ১২টি আইপিটিএসপি অপারেটরকে শর্তসাপেক্ষে পরীক্ষামূলকভাবে অ্যাপভিত্তিক কলিং সার্ভিস চালুর অনুমোদন দেয়। এর মাত্র ৩টি প্রতিষ্ঠান অ্যাপভিত্তিক কলিং সেবা চালু করেছে। তবে এখন পর্যন্ত ওটিটি সেবার কোনও রেগুলেশন তৈরি হয়নি। সম্প্রতি বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিটিআরসি ওটিটি সেবার জন্য ‘ডিরেক্টিভস অন মোবাইল অ্যাপলিকেশনস বেজড কলিং সার্ভিসেস (ওটিটি) অব দ্য আইপিটিএসপি অপারেটরস’ প্রণয়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
জানা যায়, ২০২০ সালের বিভিন্ন সময়ে নতুন করে আরও চারটি প্রতিষ্ঠান (নেশনওয়াইড আইপিটিএসপি) ডিজিকন টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড, এনআরইএসিএইচ-নেট প্রাইভেট লিমিটেড, টেলিবাংলা কমিউনিকেশন্স লিমিটেড ও রেড ডাটা প্রাইভেট লিমিটেড বিটিআরসিতে অ্যাপভিত্তিক কলিং সার্ভিস চালুর জন্য আবেদন করে। পরবর্তী সময়ে কমিশন বৈঠকে অপারেটর চারটিকে পরীক্ষামূলকভাবে ওটিটি সার্ভিস চালুর জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে বিটিআরসি ২৫০তম কমিশন বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আইপিটিএসপি অপারেটরগুলো ওটিটি সার্ভিস প্রদান সংক্রান্ত রেগুলেশন প্রস্তুত বা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আগে অনুমোদিত ১২টি নেশনওয়াইড আইপিটিএসপি’র ক্যাপাসিটি বাড়ানো হবে না। এছাড়া আইপিটিএসপি অপারেটরগুলো ওটিটি সার্ভিস প্রদান সংক্রান্ত রেগুলেশন প্রস্তুত বা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত নতুন আবেদনকারী আইপিটিএসপি অপারেটরগুলোকে অনুমোদন প্রদান করা হবে না।
আরও জানা যায়, বিটিআরসির ২৪৯তম কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেডসহ (বিটিসিএল) আগে শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া তিনটি নেশনওয়াইড আইপিটিএসপি অপারেটরের অপারেশনাল কার্যক্রম শুরুর জন্য গত ১৪ ফেব্রুয়ারি অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছে।
দেশে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল হাকিমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোবাইল অপারেটরগুলোকে সুবিধা দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে আমাদের মনে হয়েছে। এতে করে দেশীয় ওটিটি সার্ভিসগুলোকে বন্ধ করার একটা ব্যবস্থা হতে যাচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, সারাবিশ্বে প্রিমিয়াম সার্ভিস সব সময় প্রিমিয়াম রেটেই নিতে হয়। আর আমাদের দেশে প্রিমিয়াম সার্ভিস নিতে হবে কম খরচে আর দেশীয় ডিপেন্ডেড সার্ভিস নিতে হবে বেশি খরচ করে। দেশীয় ওটিটি সার্ভিসের কলরেট বাড়ানো ও ডাটা চার্জ আরোপ করা হলে কোনও গ্রাহকই আর এই সেবা নেবে না। যে বাজার তৈরি হচ্ছিলো তা ধ্বংস হয়ে যাবে।
জানা যায়, আইপিটিএসপি অপারেটররা (যারা ওটিটি সার্ভিস দেবে) কানেকটিভিটি বাড়ানোর জন্য বিটিআরসিতে আবেদন করে। অন্যদিকে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটব অ্যাপসের মাধ্যমে কল পরিচালনার বিষয়ে তাদের মতামত জানিয়ে কমিশন বরাবর চিঠি দেয়। কমিশন দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে মতামত দেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করে। গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, দেশীয় ওটিটি ব্রিলিয়ান্ট অ্যাপের তুলনায় বছর প্রতি ক্ষতি ৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ব্রিলিয়ান্ট অ্যাপের মতো আরও ১১টি অপারেটরকে কল পরিচালনা করতে দেওয়া হলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে মোট ক্ষতির ৬ শতাংশ যা বাজারকে অস্থিতিশীল করবে। কম কলরেটের কারণে অ্যাপসভিত্তিক কলিং সেবা অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ভবিষ্যতে এর চাহিদা আরও বাড়বে। এছাড়া মোবাইল কোম্পানির চেয়ে ওটিটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত সস্তা এবং পরিচালনা করাও সহজ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিনিয়ত ওটিটি সার্ভিসের জন্য মোবাইল অপারেটরদের ভয়েস কলের পরিমাণ কমছে। বিষয়টি সারাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। সব আইপিটিএসপি (১২টি) সেবা প্রদান করলে মোবাইল অপারেটরগুলোর জন্য এটি একটি হুমকিস্বরূপ হবে বলে প্রতীয়মান হয়। মোবাইল অপারেটরগুলোর গ্রাহক রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন পদ্ধতি জটিল হলেও আইপিটিএসপি অপারেটরদের এ ধরনের কোনও বাধ্যবাধকতা না থাকায় বিষয়টি বৈষম্যমূলক বলে মনে করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, মোবাইল অপারেটরদের আর অ্যাপভিত্তিক কলিং সার্ভিস অপারেটরদের বিনিয়োগের মধ্যে বিপুল পার্থক্য রয়েছে। প্রায় একই ধরনের সার্ভিসের বিপরীতে দুই ধরনের কোম্পানির বিনিয়োগের পার্থক্য বিশাল ইত্যাদি।









