ক্ষুধা যদি করোনার চেয়ে ভয়ংকর হয়?

শফিকুল ইসলাম
১২ এপ্রিল ২০২১, ১৮:২৭আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২১, ১৮:৩৫

ক্ষুধা যদি করোনার চেয়ে ভয়ংকর হয়—এমন আশঙ্কা দিনমজুর শ্রেণির মানুষের। লকডাউনের মতো কঠিন বিধিনিষেধ কিভাবে মেনে চলবেন তারা? কঠিন নিষেধাজ্ঞা চললে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বাড়বে। কর্মহীন মানুষের সংখ্যা যত বাড়বে, ততই বাড়বে এই আশঙ্কা। তাই সবকিছু বন্ধ করার আগে বিবেচনায় নিতে হবে ‘দিন আনে দিন খায়’ এমন মানুষদের জন্য কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এই বন্ধকালীন সময়। রাজধানীতে দিনমজুর শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বলছে, ক্ষুধা করোনার চেয়ে ভয়ংকর হওয়ার সুযোগ নাই। মাত্র ৭ দিনের লকডাউন। এই সময় প্রতিটি কর্মহীন পরিবারের হাতে নগদ ক্যাশ টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে। যদি লকডাউনের মেয়াদ ৭ দিনের বেশি হয়, তাহলে দেওয়া হবে অতিরিক্ত খাদ্য সামগ্রী। ই-ক্যাশের মাধ্যমে প্রতিটি কর্মহীন মানুষের হাতে পৌঁছাবে টাকা । খাদ্যসামগ্রী ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবেন জনপ্রতিনিধিরা। এখন পর্যন্ত এমন পরিকল্পনা নিয়েই এগুচ্ছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে প্রতিদিনই পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের একটি সূত্র।

জানা গেছে, লকডাউনের কারণে যারা কর্মহীন হয়ে পড়বেন তাদের জন্য সরকার ৫৭২ কোটি ৯ লাখ ২৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। যা এরই মধ্যে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি কপোরেশনগুলোর প্রতিটি ওয়ার্ডে পৌঁছে গেছে। দেশের প্রায় এক কোটি ২৪ লাখ ৪১ হাজার ৯০০ পরিবারকে ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির আওতায় এ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। পরিবারপ্রতি ৪৫ টাকা কেজি দরে ১০ কেজি চালের সমমূল্য, অর্থাৎ কার্ডপ্রতি ৪৫০ টাকা হলেও ৫০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হবে ৫০০ টাকা হারে আর্থিক সহায়তা। যা পাবে কর্মহীন প্রতিটি পরিবার। এটি করোনাকালীন প্রথম উদ্যোগ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই সহায়তা পাবেন তারা।

এছাড়াও কঠিন এবং কঠোর লকডাউন সাত দিনের বেশি বাড়লে প্রতিটি কর্মহীন পরিবারকে দেওয়া হবে ১০ কেজি চাল, এক কেজি তেল, এক কেজি ডাল, চার কেজি আলু, এক কেজি লবণ। সহায়তার এইসব পণ্য প্যাকেট করে জনপ্রতিনিধিরা পৌঁছে দেবেন নিজ নিজ এলাকার তালিকাভুক্ত কর্মহীন পরিবারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশের ৬৪টি জেলার ৪৯২টি উপজেলার জন্য ৮৭ লাখ ৭৯ হাজার ২০৩টি কার্ড এবং ৩২৮টি পৌরসভার জন্য ১২ লাখ ৩০ হাজার ৭৪৬টি কার্ডসহ মোট এক কোটি ৯ হাজার ৯৪৯টি ভিজিএফ কার্ডের বিপরীতে ৪৫০ কোটি ৪৪ লাখ ৭৭ হাজার ৫০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

পরিবারপ্রতি ১০ কেজি চালের সমমূল্য, অর্থাৎ কার্ডপ্রতি ৪৫০ টাকার সঙ্গে ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৫০০ টাকা হরে আর্থিক সহায়তা দিতে উপজেলাগুলোর জন্য ৩৯৫ কোটি ৬ লাখ ৪১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং পৌরসভাগুলোর জন্য ৫৫ কোটি ৩৮ লাখ ৩৫ হাজার ৭০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। যা এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে।

একইসঙ্গে কোভিড পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্য সহায়তার জন্য ১২১ কোটি ৬৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। ৬৪টি জেলার ৪ হাজার ৫৬৮টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা হারে মোট ১১৪ কোটি ২০ লাখ টাকা মানবিক সহায়তাও দেওয়া হবে।

সারাদেশের ৩২৮টি পৌরসভার অনুকূলে মোট ৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরির প্রতিটি পৌরসভার জন্য ২ লাখ টাকা, ‘বি’ ক্যাটাগরির প্রতিটি পৌরসভার জন্য এক লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ‘সি’ ক্যাটাগরির প্রতিটি পৌরসভার জন্য এক লাখ টাকা হারে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর, গাজীপুর এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জন্য ৭ লাখ টাকা হারে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের জন্য ৫ লাখ টাকা হারে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ৬৪টি জেলার জেলা প্রশাসনের অনুকূলে ‘এ’ ক্যাটাগরির জন্য ২ লাখ টাকা ‘বি’ ক্যাটাগরির জন্য এক লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ‘সি’ ক্যাটাগরির জন্য এক লাখ টাকা হারে মোট এক কোটি ৭৭ লাখ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞায় অনেককিছু বন্ধ বা সীমিত পরিসরে চালু থাকলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন নিম্ন আয়ের মানুষ। দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ, বস্তিবাসী। তাদের তাৎক্ষণিক সহায়তা, খাদ্যের যোগান দেওয়া বিষয়ে ঘোষণায় তেমন কিছুই উল্লেখ থাকে না। 

অপরদিকে দেখা গেছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্দশা কমানোর জন্য সরকারি সহায়তা প্যাকেজ বেশিরভাগই প্রাপকের হাতে পৌঁছায় না। চর, হাওর, উপকূলীয় এবং বস্তি অঞ্চল, দলিত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং দেশে ফিরে আসা প্রবাসী কর্মীরাও এ থেকে বাদ যান না। এমন সব দুর্যোগে সরকারি সহায়তার প্রতিশ্রুতি আ অনুদান বা বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও মানুষের আয় কমে যায়। তার পরেও তারা সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজধানীর কাওরান বাজারের কিচেন মার্কেটের দিনমজুর মোকলেছুর রহমান জানিয়েছে, এতদিন লকডাউন চললেও মার্কেট খোলা ছিল। কাজ করেছি, আয় করেছি।  কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু এবারের লকডাউনে যদি মার্কেট বন্ধ থাকে, তাহলে আমরা চলবো কিভাবে ? এই শহরে সরকারি অনুদান বা বরাদ্দ আমাদের কে দেবে ? কিভাবে এক সপ্তাহ ছেলেমেয়ে নিয়ে পার করবো আমরা ? আমাদের তো জমা কিছু নাই, যে এই সময় তা ভেঙে খাবো। আমরা তো দিন আনি দিন খাই।

এ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানিয়েছেন, কঠিন লকডাউনের কথা বিবেচনা করেই সরকার এরই মধ্যে ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা ইতোমধ্যেই পৌঁছে গেছে। মাত্র এক সপ্তাহের লকডাউন। তেমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। হবেও না। এই বরাদ্দ থেকে প্রতিটি কর্মহীন পরিবার হাতে নগদ ৫০০ টাকা পেয়ে যাবেন। তবে করোনা সংক্রমণ রোধ পরিস্থিতি উন্নত না হলে লকডাউন দীর্ঘায়িত হলে সরকারের তরফ থেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে আগের ন্যায়। কাজেই এক্ষেত্রে ক্ষুধা করোনার চেয়ে ভয়ংকর হওয়ার সুযোগ নাই। পেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে, এখন জীবন বাঁচানোই সরকারের প্রথম কাজ। 

/এমআর/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম