গত শনিবার (২৬ জুন) সন্ধ্যার দিকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মধুপুর চৌকির কাছে বিএসএফের সীমান্তরক্ষীরা ছিলেন অতিরিক্ত সতর্ক। গোয়েন্দা সূত্রে বাহিনীর ৮২ ব্যাটেলিয়নের খবর ছিল, সন্ধ্যার আঁধারে দালালরা এক দম্পতিকে সীমান্ত পার করানোর চেষ্টা করবে।
বিকাল সাড়ে চারটা নাগাদ বর্ডার রোডে এক পুরুষ ও এক নারীকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে সীমান্তরক্ষীরা তাদের আটকান। কথাবার্তায় অসঙ্গতি মেলায় দুজনকেই আটক করা হয়। এরপর বিএসএফের জেরার মুখে ওই দুজন যা বলেন, তা শুনে কর্মকর্তাদের চক্ষু চড়কগাছ!
ধৃত পুরুষটি জানান, তার নাম জয়কান্ত চন্দ্র রায়। বয়স চব্বিশ। তিনি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার শান্তিপুরের বাসিন্দা, গ্রামের নাম বল্লভপুর। ফেসবুকে চ্যাট করতে করতেই মাসকয়েক আগে প্রেমে পড়েন বাংলাদেশের একটি মেয়ের, যার নাম পরিণীতি (ছদ্মনাম)। বিএসএফ-কে পরিণীতি জানিয়েছে, তার বাড়ি নড়াইল জেলায়। তার বয়স আঠারো বছর।
করোনার যুগে এমন 'আন্তর্জাতিক' প্রেমের সফল পরিণতি হওয়াটা কঠিন বটে। কিন্তু জয়কান্তের জেদ চেপে গিয়েছিল প্রেমিকাকে বিয়ে করেই ছাড়বে। নদীয়ার তারকনগরে স্থানীয় এক দালাল অপুকে ধরে সীমান্ত পেরোনোর ব্যবস্থাও করে ফেলে। গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে পৌঁছেও যায় পরিণীতির বাড়িতে।
পাত্রীর বাড়ির লোকেদের নাকি এই বিয়েতে অমত ছিল না। কাজেই দুদিন পর (১০ মার্চ) দুজনের চারহাত এক হয়ে যায়। হিন্দু রীতিতে বাংলাদেশেই বিয়ে হয় জয়কান্ত ও পরিণীতির।
সেই বিয়ের অনুষ্ঠানের একটি ছবিও দুজনের কাছ থেকে পাওয়া গেছে। যা পরে বিএসএফের পক্ষ থেকে প্রকাশও করা হয়েছে।
বিএসএফকে জয়কান্ত আরও জানিয়েছেন, বিয়ের পর প্রায় সাড়ে তিন মাস তিনি শ্বশুরবাড়ির আদরযত্নেই ছিল। কিন্তু নানা প্রয়োজনে ভারতে ফেরাটা জরুরি হয়ে ওঠে। ওদিকে মহামারির কারণে সীমান্ত সিল করে দেওয়ায় দেশে ফেরাও কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত রাজু নামের এক বাংলাদেশি দালাল দশ হাজার টাকার বিনিময়ে বর্ডার পার করিয়ে দেবে বলে কথা দেয়। তার ভরসাতেই স্বামী-স্ত্রী সেদিন মধুপুর দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে ঢোকার চেষ্টা করেছিল।
জেরার মুখে পরিণীতিও সীমান্তরক্ষীদের জানিয়েছেন, তিনি জয়কান্তর অগ্নিসাক্ষী রেখে বিয়ে করা স্ত্রী। দুজনের মধ্যে অনেকদিন ধরেই যে গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক, সেটাও কবুল করেছেন। এমনকি বিএসএফের যে কর্মকর্তারা তাদের দুজনকে জেরা করেছেন, তারাও নিশ্চিত যে জয়কান্ত ও পরিণীতি একে অন্যের প্রেমে একেবারে 'হাবুডুবু'!
তা হলে সীমান্তের বাধা-না-মানা এমন এক অপরূপ প্রেম ও পরিণয়ের রাস্তায় বিএসএফ কেন বাধা হয়ে দেখা দিচ্ছে?
৮২ ব্যাটেলিয়নের কমান্ডিং অফিসার সঞ্জয় প্রসাদ সিং বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, 'সমস্যাটা অন্য জায়গায়। দুই দেশের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভাবভালোবাসা হলে আমাদের কীসের আপত্তি? কিন্তু আজকাল প্রেমের ফাঁদে ফেলে বাংলাদেশ থেকে নারীপাচারের ঘটনা অহরহ ঘটছে। কাজেই আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে প্রেমটা সত্যিকারের নাকি এটা পাচার করার একটা ফাঁদ।’
'তা ছাড়াও ওই ব্যক্তি কোনও পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। একইভাবে ভারতেও ফেরার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের ওই মেয়েটিও অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকেছে। ফলে দুজনের বিরুদ্ধেই আইনগতভাবে ব্যবস্থা নিতে আমরা বাধ্য।'
তবে বিএসএফ কর্মকর্তারা নিজেরাও যেহেতু প্রায় নিশ্চিত যে জয়কান্ত ও পরিণীতির প্রেমের ঘটনা 'খাঁটি', তাই দুজনকে যথেষ্ট সহানুভূতির চোখেই দেখা হচ্ছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
ইতোমধ্যে পরিণীতি বাংলাদেশে নিজের যে ঠিকানা দিয়েছেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে সে তথ্য দিয়ে সেখানে খোঁজখবর নিতে বিএসএফের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। জয়কান্তের 'ব্যাকগ্রাউন্ড'ও চেক করা হচ্ছে নদীয়ার শান্তিপুরের গ্রামে।
কিন্তু নদীয়ার জয়কান্ত ও নড়াইলের পরিণীতি শেষতক ভারতের মাটিতে তাদের স্বপ্নের সংসার পাততে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মেঘ কাটেনি। অবৈধভাবে সীমান্ত পেরোনোর দায়ে দুজনের কপালেই ঝুলছে জেল খাটার আশঙ্কা!









