জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবরা ছিলেন দুই বোন। তার বড় বোন ছিলেন বেগম জেবুন নেছা। তার ছেলে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, বর্তমানে জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম। তিনি তার শৈশবে টুঙ্গিপাড়ায় থাকতে খালা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সান্নিধ্য পেয়েছেন। আবার ঢাকায় এসে পড়াশোনা ও রাজনীতি করতে গিয়েও ১৯৬২ সাল থেকে ৭৫-এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালেও তিনি বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে থেকেছেন। এ সময়ও পেয়েছেন খালার স্নেহ-ভালোবাসা। মাতৃকুলে জীবিত একক ব্যক্তি হিসেবে নানা-নানি বা মামার আদর বলতে শেখ শহীদুল সবই পেয়েছিলেন বেগম মুজিবের কাছ থেকে।
বেগম মুজিবকে ঘিরে রয়েছে শেখ শহীদুল ইসলামের অসংখ্য স্মৃতি। রবিবার (৮ আগস্ট) বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯১তম জন্মদিন উপলক্ষে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি। তার কথায়, জীবনের এসব স্মৃতি বলে শেষ করা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় অল্প সময়ে পুরোটা তুলে ধরা। তারপরও কয়েকটা ঘটনা তুলে ধরছি।
শেখ শহীদুল ইসলাম জানান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন তার এক বছরের বড়। আর বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামাল ছিলেন তার চেয়ে এক বছরের ছোট। বয়সে এক বছরের ছোট শেখ কামালের সঙ্গেই শেখ শহীদের বেড়ে ওঠা। শিশুকালে টুঙ্গিপাড়ায় শেখ কামালের সঙ্গে খেলাধুলা করে সময় কাটিয়েছেন। আবার ঢাকায়ও শেখ কামালের সঙ্গে বড় একটা সময় কাটে।
শিশু ও ছাত্রজীবনে খালা বেগম মুজিবের সঙ্গে অজস্র স্মৃতির বলতে গিয়ে শেখ শহীদ ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ভোট গণনার দিনে তার জীবনের বেদনাদায়ক ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের ভোট গণনার দিনে তার পিতা (শেখ মো. মুসা) বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনি এজেন্ট হিসেবে গোপালগঞ্জে গিয়েছিলেন। সেদিন তিনি (শেখ শহীদ) আর শেখ কামাল খেলতে বেরিয়েছিলেন। খেলতে খেলতে একসময় তিনি পুকুরে পড়ে তলিয়ে যান। অনেক পরে নাকি সন্ধান মেলে তার। তখন তার শ্বাস-প্রশ্বাসও চলছিল না। সবাই ভেবেছিলেন তিনি (শেখ শহীদুল) মারা গেছেন। এমনকি এমন মন্তব্যও নাকি করা হয়েছিল যে ওর আব্বা না আসা পর্যন্ত কবর দেওয়া যাবে না। তখন বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব বলেছিলেন, না আমার শহীদ মরতে পারে না। তিনি সবাইকে বললেন, তোমরা চেষ্টা করো। তখন পাশের বাসার এক মামা তাকে মাথার ওপরে নিয়ে আস্তে আস্তে ঝাঁকি দিতে থাকলেন। তারপর পেট থেকে পানি বের হয় এবং একপর্যায়ে তার হুঁশ ফেরে। সুতরাং তিনি যে আজ বেঁচে আছেন সেটা তার খালাম্মার (বঙ্গমাতা) ‘সেদিনের প্রচেষ্টা আর ওপরে আল্লাহ হায়াত রেখেছিলেন’ বলে মনে করে শহীদুল ইসলাম। এই ঘটনাটি মা ও খালার কাছ থেকে পরবর্তী সময়ে শুনেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
খালার আদর ভালোবাসার স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসায় থাকতেন। তার খালা শেখ কামাল এবং তাকে আলাদা করে দেখতেন না। কামালের জন্য যেটা করতেন তার জন্যও সেটাই করতেন। বাইরে যখন যেতেন কামালের জন্য যে কাপড় আনতেন তার জন্যও সেটা আনতেন। তার ভাষায়, যতদিন খালাম্মা বেঁচে ছিলেন, সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পোশাক তার কাছ থেকেই পেয়েছি। আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও দামি কাপড়চোপড় তিনিই দিয়েছেন।
শেখ শহীদুল ইসলামের কোনও মামা ছিল না, নানা-নানির সান্নিধ্য পাননি। তার কথায়, মামা বলেন, আর নানা-নানি বলেন, সবই তিনি ছিলেন। আমার সব আবদার-অভাব তিনি একাই পূরণ করেছেন।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাবিরোধী আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হয়েছিলেন উল্লেখ করে সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা বলেন, ওই সময় কারাগারে থাকাকালে তিনি (বঙ্গমাতা) প্রতি ১৫ দিন পর পর আমাকে দেখতে যেতেন। কামাল-জামালও আমাকে দেখতে যেতেন। সেই দিনগুলো ভোলার মতো নয়। আমার পিতামাতা গ্রামে থাকতেন। ঢাকায় তিনি ছিলেন আমার অভিভাবক। আমার জন্য তিনি যা করেছেন তা বলে শেষ করা যাবে না।
তিনি জানান, বেগম মুজিব সন্তানদের জন্য ছিলেন স্নেহময়ী মাতা, আমার জন্য ছিলেন স্নেহময়ী খালা। আমি তার অকৃপণ স্নেহ পেয়েছি। সেই স্নেহ পেয়েছিলাম বলেই আমার রাজনীতি ও শিক্ষাদীক্ষা করতে পেরেছি।









