বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিটি করপোরেশনের দুই কর্মকর্তাকে নির্যাতনের ঘটনায় বিব্রত পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এ নিয়ে ডিএমপি ও পুলিশ সদর দফতরে শীর্ষ কর্মকর্তাদের একাধিক রুদ্ধদ্বার বৈঠকও হয়েছে। দুটি ঘটনা তদন্তে পুলিশ সদর দফতর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে একাধিক তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এ সব ঘটনা নিয়ে বিব্রত পুলিশ প্রশাসন নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে শনিবার দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পুলিশের পক্ষ থেকে ডিএমপি’র মুখপাত্র যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম পুলিশ বাহিনীর অবস্থান পরিষ্কার করেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পুলিশ সপ্তাহকে সামনে রেখে এমন ঘটনায় পুরো পুলিশ প্রশাসনই বিব্রত ও ক্ষুব্ধ। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ কম বেশি সবসময় থাকবে। সেগুলো নিয়ে পুলিশের ওপর মানুষের অনেক অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। কিন্তু এসব বেপরোয়া পুলিশ সদস্যের আচরণে পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। সেজন্য পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও এসব বিষয়ে কোনও ছাড় না দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতেও সিদ্ধান্ত নেন তারা।
যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরের ঘটনার রেশ না কাটতে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে এক হিজড়ার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে ওই হিজড়া সদস্য কমলাপুর জিআরপি থানায় অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ সদস্যরা তাকে থানা থেকে বের করে দেন। ঘটনার ব্যাপারে ঢাকা জিআরপি থানার ওসি আব্দুল মজিদ বলেন, ইজতেমার কারণে রেলস্টেশনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রেলস্টেশনের ওভারব্রিজের ওপর ঘুমিয়ে থাকা হিজড়া সদস্যের কাছ থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বী ও সিটি করপোরেশন কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র দাসের বিষয়ে ডিএমপি’র মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম জানান, কোনও পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত অপরাধের দায় বাহিনী নেবেনা। দু’টি ঘটনায় ডিএমপি ও পুলিশ সদর দফতর থেকে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলোর সুপারিশ অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরইমধ্যে মোহাম্মদপুরের ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে নির্যাতনের ঘটনায় এসআই মাসুদ শিকদার ও যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় আরশাদ হোসেন আকাশকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
বিগত এক সপ্তাহে দু’টি ঘটনায় পুলিশের বেপরোয়া মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির মুখপাত্র মনিরুল ইসলামের বলেন, দুই-একজনের আচরণ সেটা প্রমাণ করে না। কারও ব্যক্তিগত অপরাধের দায়ও বাহিনী নেবে না।
অপরাধী পুলিশ সদস্যদের তদারক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে মনিরুল বলেন, এসব ঘটনায় টহল পুলিশের অন্য সদস্যদের জড়িত থাকা এবং তদারক কর্মকর্তাদের কোনও অবহেলা ও গাফিলতি আছে কি না—সেটাও তদন্ত কমিটিগুলো খতিয়ে দেখবে। তদন্ত কমিটিগুলোর সুপারিশ ও নির্দেশনা অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত বছরের জুন মাসে থানাগুলোয় চিঠি দিয়ে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সাদা পোশাকে পুলিশের টহল নিষিদ্ধ করেছিলেন। এরপরও সাদা পোশাকে পুলিশ টহল দিচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরুল বলেন, সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করা যাবে না—এমন কথা ঠিক নয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী অপারেশনের কৌশল হিসেবে সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ রয়েছে। তবে যাত্রাবাড়ীতে দায়িত্ব পালনের সময় যারা সাদা পোশাকে ছিলেন, তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়েছিলেন কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা হবে।
পুলিশের বিরুদ্ধে পুলিশের তদন্ত কতটুকু গ্রহণযোগ্য জানতে চাইলে মনিরুল বলেন, ভুল-ত্রুটি থাকতেই পারে। তবে অবশ্যই পুলিশের ওপর আস্থা রাখতে হবে। কারণ পুলিশই বহু চাঞ্চল্যকর এবং ক্লুলেস ঘটনারও রহস্য বের করে আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
গত শনিবার ৯ জানুয়ারি রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের সহকারী কর্মকর্তা গোলাম রাব্বী টহল পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হন। মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদ শিকদারসহ পুলিশ ও আনসারের পাঁচ সদস্য রাব্বীকে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করে।
অন্যদিকে, শুক্রবার ভোরের রাজধানীর মীরহাজিরবাগ এলাকায় কর্তব্যরত অবস্থায় বিকাশকে বেদম মারধর করে পুলিশ। যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আরশাদ হোসেন আকাশের নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন পুলিশ সদস্য বিকাশকে ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে বেদম মারধর করে।
/এমএনএইচ/
/আপ-এএ/








