কনে সামিনা নওগাঁর মেয়ে, আর বর জামালপুরের। বর থাকেন সৌদি আরবে। দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু বিয়ের জন্য দেশে আসতে পারবেন না ছেলে। সিদ্ধান্ত হয়, বিয়ে হবে টেলিফোনে। নির্ধারিত দিনে তাদের বিয়ে হয় ঠিকই। কিন্তু ছেলের যে ছবি দেখে কনে কবুল বলেছিলেন, সাক্ষাতে পাল্টে যায় সে চেহারা।
এখানেই শেষ নয়। অন্য চেহারার বরকে মেনে নিলেও পরবর্তী সময়ে আরও গরমিল দেখা যায়। জানা যায়, বর আর বিদেশে যাবেন না। সেখানে তিনি শ্রমিকের কাজ করতেন এবং অনুপ্রবেশের দায়ে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সামিনার জীবনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা খুব একটা বিরল নয়। এমনকি এ ধরনের প্রতারণায় বিয়ে ভেঙে যাওয়ার খবরও পাওয়া যায় অহরহই।
ধর্মীয় নেতারা বলছেন, টেলিফোনের বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে শরিয়াহ অনুয়ায়ী এতে কোনও বাধা নেই। তবে নারীনেত্রীরা মনে করছেন, কোনও অবস্থাতেই না দেখে বিয়ের ব্যবস্থা করা উচিত নয়। এতে নারীর ভবিষ্যত অনিশ্চয়তায় পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বেশ কয়েকটি কাজি অফিসে কথা বলে জানা গেছে, একাধিক পদ্ধতিতে টেলিফোনে বিয়ে হয়ে থাকে। কোনওটিতে মেয়ের বাসায় কাজি উপস্থিত থেকে টেলিফোনে বিয়ের পর কনের স্বাক্ষর নিয়ে রাখেন। পরবর্তী সময়ে ছেলের স্বাক্ষরের জন্য জায়গা রেখে দেওয়া হয়। দেশেই একাধিক সাক্ষী সাক্ষর করেন।
আরেক পদ্ধতিতে স্কাইপে উভয় পরিবারকে সামনাসামনি আনা হয়। তারপর বিয়েটা পড়ানো হয়। সেক্ষেত্রে উভয়স্থানে সাক্ষী থাকতে হবে এবং তারা উভয়েই স্বাক্ষর দেবেন। তবে কাজিরা বলছেন, বাংলাদেশে অনেকক্ষেত্রেই এ রকম কোনও নিয়মই মানা হয় না। উভয় পরিবার রাজি থাকলে বিয়েটা হয়ে যাবে। তারপর কাগজপত্র তৈরি করে কাবিনের পর মেয়েকে তা পাঠিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক ধরে টেলিফোনে বিয়ের রেওয়াজ চলছে। আর একেক জায়গায় একেকভাবে এ ধরনের বিয়ে পড়ানো হয়।
এ প্রসঙ্গে ধর্মবিশ্লেষক মুহাম্মদ সাইফুল্লাহকে বলেন, ‘এ ধরনের বিয়েতে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা বেশি। বিয়ে কেবল ধর্মীয় নিয়মেই হয় এমন নয়। এটার ক্ষেত্রে সামাজিক কিছু নিয়মও আছে। এরমধ্য দিয়ে অপরিচিত দুটি পরিবারের সম্পর্ক হয়। তবে ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী এটি জায়েজ। কিন্তু যেখানে টেলিফোনে বিয়ে হবে, সেখানে দুই জায়গাতেই সাক্ষী থাকতে হবে। অর্থাৎ প্রবাসে এবং দেশে দুই জায়গাতেই সাক্ষী থাকতে হবে।’
তবে কাজি আমির হোসেন বলেন, সাক্ষীরা যদি বিয়ের অনুষ্ঠানে বর বা বরের উকিল এবং কনের উকিলকে সামনাসামনি না দেখেন, তাহলে বিয়ে হবে না। সে রকম একই বৈঠকে বিয়ের অনুষ্ঠান হতে হবে। বৈঠক আলাদা হলে বিয়ে হবে না। তবে, এসব নিয়ে নানা মতবিরোধ রয়েছে। তিনি জানান, টেলিফোনে বিয়ের ক্ষেত্রে যেহেতু বর এক দেশে এবং কনে বা কনের উকিল অন্য দেশে অবস্থান করেন, আর সাক্ষীরা ইজাব-কবুল ফোনের মাধ্যমে শুনে থাকেন, সরাসরি বর বা বরের উকিল, কনে বা কনের উকিলকে দেখেন না এবং তাদের কথাও শোনেন না; সেহেতু ইসলামের দৃষ্টিতে এমন বিয়ে জায়েজ নয়।প্রাচীনকালে ফোন ছিল না, তাই ফোনে বিয়ের বিষয়টি সেকালের কিতাবগুলোয় সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। তবে পরবর্তী সময়ে কিভাবে বিয়ে হতে হবে সে ব্যাখ্যাগুলো পড়লে বোঝা যায় এভাবে বিয়ে না দেওয়াটা সমীচীন। সেক্ষেত্রে, স্কাইপে বিয়ের বৈধতা আরেকটু বেশি বলেও মনে করেন তিনি। কারণ, সেক্ষেত্রে পাত্রপাত্রীরা পরস্পরকে দেখে কবুল বলতে পারেন।
স্কাইপিতে বিয়ের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে ইতালিতে বসবাসকারী সামিউল বলেন, ‘আমরা আমাদের পার্টি সেন্টারে ছিলাম, কনেরা বাংলাদেশের পার্টি সেন্টারে। কাজি মেয়ের বাড়ির তত্ত্বাবধানে এসেছিলেন। তিনি স্কাইপে বিয়ে পড়ান। দেশে থাকা আমার দুই সাক্ষী সেখানে স্বাক্ষর করেন। আমার পরিবারের সবাই আমার সঙ্গে বিদেশে আমার সঙ্গে থাকেন। আমাদের দুই পরিবারের ভেতর আগে থেকে পরিচয় থাকায় টেনশনের বিশেষ কিছু ছিল না। কিন্তু আমার পরিচিত অনেকেরই টেলিফোনে বিয়ে হওয়ায় বিয়ে ভেঙে গেছে। শ্রমিক শ্রেণির যারা আছেন, তারা সবসময় কনের পরিবারের সঙ্গে স্কাইপ করার সুযোগ পান এমনটাও ঘটে না।
এদিকে, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, ‘বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের পরিবারের সতর্ক হওয়ার বিষয় আছে। খুব বেশি পরিচিত না হলে এভাবে টেলিফোনে বিয়ের বিষয়ে রাজি হওয়া মানে মেয়েকে কোথায় আপনি ভবিষ্যতে দেখবেন তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।’
/এফএস/ এমএনএইচ/আপ-এনএস/








