অবশেষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ঘোষিত পে-স্কেল সংশোধন করার পক্ষে মত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ঘোষিত পে-স্কেলে পদোন্নতিসহ বেতন বৈষম্যের অভিযোগ এনে প্রকৃচিসহ (প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিৎসকদের জোট) বিসিএস-এর ২৬টি ক্যাডার কর্মকর্তা, শিক্ষক, বাংলাদেশ ব্যাংক, নন ক্যাডার কর্মকর্তারা এটি সংশোধনের দাবি জানালে সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় আন্দোলনকারীদের পে-স্কেল সম্পর্কে জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। এ বিষয়ে বেশ কয়েকবার সাংবাদিকরা অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করলে কখনও রাগান্বিত সুরে আবার কখনও বিরক্তির সুরে বলেছিলেন, ‘কোনওভাবেই ঘোষিত পে-স্কেল সংশোধন বা পরিবর্তন করা হবে না। পরিবর্তনের সুযোগ নেই। যারা আন্দোলন করছেন তাদের পে-স্কেল সম্পর্কে জ্ঞান কম।’ অবশেষে বুধবার অর্থমন্ত্রী নিজেই সাংবাদিকদের ডেকে বলেছেন, আন্দোলনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট কোনও প্রস্তাবনা এলে তা পে-স্কেলের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে।
এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির প্রবেশ পদে ক্যাডারদের মতো নন-ক্যাডারদের ৮ম গ্রেডে বেতন-ভাতার সুযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল এবং টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড ছাড়াই শিক্ষকদের পদমর্যাদা ও সুবিধা বহাল রেখে বেতন স্কেলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আন্দোলন নিরসনের পথ প্রশস্ত হলো।
বুধবার অর্থমন্ত্রী বলেন, আলোচনার ভিত্তিতে কোনও প্রস্তাবনা এলে তা নতুন করে ঘোষিত পে-স্কেলের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি একথা বলেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির সভায় ঘোষিত পে-স্কেল সংশোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠিত হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সচিব কমিটি কর্তৃক পে-স্কেলের বৈষম্য দূরীকরণে গঠিত কমিটি ইঙ্গিত দিয়েছে, আগামী এপ্রিলের মধ্যে বিভিন্ন পেশাজীবীর বেতন বৈষম্যের নিরসন হবে। টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড তুলে দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ক্যাডারদের পদোন্নতি নিয়ে যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে, তারও সমাধান হবে। নতুন পদ সৃষ্টি না করেই পুরনো পদ সমন্বয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট সঙ্কট দূর করার পাশাপাশি পদোন্নতির বিষয়টি স্পষ্ট করা হবে। এ ক্ষেত্রে ২৬টি ক্যাডারের কয়েকটি পদকে আপগ্রেড করে গ্রেড-১ এবং গ্রেড-২-এর পদ বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি ক্যাডার-নন ক্যাডারদের এন্ট্রি পদের বেতন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতারও নিরসন হবে।
তবে পে-স্কেল সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেও সচিবরা তাদের প্রশাসন ক্যাডারের একক কর্তৃত্ব ছাড়তে রাজি নন। প্রশাসনের সবখানে সচিবদের একক ক্ষমতা বহাল রাখতে পে-স্কেলের ১ নম্বর গ্রেডে মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত কোনও প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি প্রশাসন ক্যাডারের না হন এবং তাকে যদি গ্রেড-১ মর্যাদা (সচিবের মর্যাদা) দেওয়া হয় সে ক্ষেত্রে তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যেন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছেই থাকে সে বিষয়টির দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। সে লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটিকে ‘হালাল’ করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১ হাজার ৪০০ প্রকৌশলীর পে-স্কেল নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাদের পদোন্নতির পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাধিক ক্যাডারের মধ্যে বৈজ্ঞানিকও রয়েছেন। নতুন পে-স্কেলে তাদের পদোন্নতিতেও সমস্যা দেখা দেবে বলে তারা দাবি করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অধিদফতরের প্রধানদের গ্রেড-১ দেওয়ায় সচিবদের আলাদা মর্যাদা দেওয়ার দাবি করেছেন অনেক সচিব। এ ছাড়া শিক্ষকদের দাবি তো রয়েছেই।
এদিকে গত সোমবার সন্ধ্যায় গণভবনে অনুষ্ঠিত পিঠা উৎসবে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশন নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের দাবি বিবেচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি পেয়ে শিক্ষকরা আন্দোলন ছেড়ে ক্লাসে ফিরে গেছেন। যদিও এ সময়ে অর্থমন্ত্রী মুহিত চীনের নেতৃত্বে গঠিত এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সদস্য হওয়ার জন্য বেইজিংয়ে অবস্থান করছিলেন।
শিক্ষকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে জানতে জাইলে তিনি বলেন, তারা বেতন কাঠামো না বোঝার কারণেই আন্দোলন করেছেন। এ বিষয়ে আমি কোনও কথা বলবো না। শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি দেখছেন।
অর্থমন্ত্রী বেতন কাঠামো নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে নিজের দোষ স্বীকার করে বলেছেন, এখানে আমাদের কিছু ত্রুটি ছিল। ইতোমধ্যে সংশোধন হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ জন্যই আন্দোলন থেকে সরে গেছেন।
/এসআই/এফএ/








