আব্দুল হান্নান খান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধের (ট্রাইব্যুনালস) তদন্ত সংস্থা ২০১১ সালে পুনর্গঠিত হলে তাকে সমন্বয়কের পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আপত্তির কারণে সংস্থার সদস্য ও সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সিআইডি) খসরুল হককে বাদ দেওয়া হলে সংস্থায় জ্যেষ্ঠ তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল হান্নান নিয়োগ পান ২০১১ সালের ১১জানুয়ারি। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেল হত্যা মামলার তদন্তের প্রধান তদারকি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তদন্তের সমস্যা, চ্যালেঞ্জ আর আত্মসমালোচনার জায়গা থেকে নিজেদের নিয়ে তিনি বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত আলাপে বলেন, এখন তারা ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিষয়ে সিরিয়াসলি কাজ করছেন এবং তাদের অনুপস্থিতিতেই এই বিচার সম্পন্ন হবে। সম্প্রতি এসব বিষয় নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হন আব্দুল হান্নান খান।
১৯৫ জনের বিচারের তদন্তে অগ্রগতি নিয়ে যদি কিছু বলেন?
পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধী সেনাদের বিচারের দাবি বহু পুরনো। এটা পাকিস্তানেরই করার কথা ছিল, কিন্তু তারা সেটা করেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিচার হওয়া জরুরি মনে করায় আমরা পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে কমিটি গঠন করেছি। এসব যুদ্ধাপরাধীর মধ্যে এখন পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া গেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর ৫ জনসহ মোট ২০০ কর্মকর্তার নাম। এ সংখ্যা আরও বাড়তে বা কমতে পারে। এ সব বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের জন্য ৫ সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয়েছে সংস্থার উপ-পরিচালক মতিউর রহমানকে। অন্য চার সদস্য হচ্ছেন উপ-পরিচালক হেলাল উদ্দিন এবং তিন সহকারী পরিচালক নূরুল ইসলাম, মনোয়ারা বেগম ও আব্দুর রাজ্জাক খান। পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবে কমিটি। এখন পর্যন্ত বলার মতো এটুকুই অগ্রগতি হয়েছে।
এই যে আপনারা ১৯৫ জনের বিচারের জন্য তদন্তের শুরু করলেন, এতে সরকারের দিক থেকে কোনও সিদ্ধান্ত আছে কি না, আর এই বিচারের প্রক্রিয়াটা কী হবে?
না, আমরা তদন্তের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছি। আমরা যা পাব, তা সংগ্রহ করে প্রসিকিউশনের হাতে দিয়ে দেব। তারপর বাকি প্রক্রিয়া হবে। সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনও আলাপ হয়নি। আর বিচারের পদ্ধতি একটাই। আমাদের আইনে এই বিচারে কোনও বাধা নেই। আইনের তিন ধারায় বলা হচ্ছে, একটা দল, আর্মফোর্সের লোক এবং তাদের সহকারী যারা ছিলেন, তারা ও ইরেসপেকটিভ অব ন্যাশনালিটির ক্ষেত্রে বিচারের আওতায় আনা যাবে। মানে হলো, যদি পাকিস্তান কেবল না অন্য কোনও দেশের কেউ আমাদের দেশে অপরাধ করে, তাদেরও আমরা বিচারের মুখোমুখি করতে পারব। আমরা তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের সব অভিযোগই প্রমাণ করতে পারব। যুদ্ধাপরাধ প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্তও আছে।
অপরারেশন সার্চ লাইটের নামে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, সেটা তো গণহত্যাই। কেবল মেধাবীরা নন, সাধারণ মানুষও সেদিন মারা গেছেন। যুদ্ধাপরাধের ক্ষেত্রে যদি অ্যাকশনটা মিলিটারি নেসিসিটি হয়ে থাকে, তাহলে সেটা জাস্টিফাইড হয়, আর তা না হলে জাস্টিফাইড হয় না। রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করা, ধবংসযজ্ঞ চালানো, এটা কোনও মিলিটারি অ্যাকশনের নেসিসিটি ছিল না। এ দায়-দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। মামলা প্রমাণ করা খুব সহজ।
কিন্তু যখন দুটা ভিন্ন রাষ্ট্র হয়ে গেছে, তারা যদি তাদের সেনাদের ফেরত না পাঠায়, তাহলে তখন কিভাবে বিচার করা সম্ভব?
কোনও সমস্যা নেই। এ বিচার হবেই। আমাদের যে আইন আছে, সেখানে এ বিচারে কোনও বাধা নেই। অপরাধের স্থানতো আমার দেশ। আমরা এখন পর্যন্ত যেটা মনে করছি, এই যুদ্ধাপরাধীদের অনুপস্থিতিতে বিচার করব। গণ আদালতে তাদের বিচার হতে পারে কিন্তু সেটার আইনগত কোনও ভিত্তি নানে। কিন্তু গণ আদালত দিয়ে আইনগত ভিত্তি সৃষ্টি করা যায়। আমরা এখন প্রাথমিক তদন্ত পর্যায়ে আছি। যখন এই বিচার করব সবার অনুপস্থিতিতেই বিচার করা সম্ভব। এখানে জাতিসংঘ থেকে শুরু করে কোনও দেশ বাধা দিতে পারবে না।
এবার একটু পেছনের দিকে তাকাই। তদন্ত সংস্থার ৬ বছরের মাথায় এসে তদন্ত করার ক্ষেত্রে আপনার কাছে বড় চ্যালেঞ্চ কী ছিল বলে মনে হয়?
প্রথমত, চল্লিশ বছরের আগের ঘটনা। এটাকে স্মরণে রাখাও কিন্তু মুশকিল। আবার অনেক ভিকটিম মারা গেছেন, আসামিও মারা গেছেন। সে ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ-প্রক্রিয়া খুব জটিল ছিল। কারণ আমাদের ‘আর্কাইভাল এটিটিউড’ ছিল না। যারা মাঠে যুদ্ধ করেছেন এবং লিখে রেখেছেন। পরবর্তী সময়ে বই লিখেছেন, তাদের তথ্যের ধরন একরকম, যারা গবেষণা করে লিখেছেন, তাদের ধরন আরেক রকম। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতার পরপরই যেটুকু কাজ শুরু হয়েছিল, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের পর সেটা স্থিমিত হয়ে যায়। এমনকি মনে রাখবেন, আমরা বাঙালিরা ব্যক্তিজীবনেও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের বিষয়েও মনোযোগী নই। আমি নিজে যখন মুক্তিযুদ্ধে ছিলাম, আমার আপন ভাই দুর্গাপুর থেকে আমাকে চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু আমি সেটা সংগ্রহে রাখিনি। এসব কারণে তথ্য-উপাত্তের জন্য অনেক সময় গেছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা ‘কনটিনিউয়াসলি’ দেশের ভেতর থাকেননি। তারা এপার-ওপার আসা যাওয়ার ভেতর ছিলেন। ফলে, সত্য তারাই দিতে পারেন, যারা ৯মাস দেশে ছিলেন। এক পর্যায়ে গিয়ে আমরা দেখলাম, সবচেয়ে ভালো সাক্ষী হতে পারেন ভিকটিম পরিবার ও তাদের স্বজনেরা। যে লোকটাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেছে, তার পরিবারই তো পুরোটা জানে। সেটাই নির্ভরযোগ্য সাক্ষী। এসব বুঝতে কিছু সময় লেগে গেছে।
এই সময়ে তদন্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
এখন আমরা যতই তৃণমূলে যাচ্ছি অপরাধী খুঁজতে, ততই আমরা লিখিত দলিল কম পাচ্ছি। শীর্ষ নেতাদের ক্ষেত্রে দালিলিক প্রমাণ ছিল। তাদের প্রচুর বক্তৃতা, ভিডিও আমরা সহজে পেয়েছি। কিন্তু স্থানীয়ভাবে যারা ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের বিষয়ে কোনও লেখালেখিও পাওয়া যায় না। তারপর ৭৫’এর পর কেউ লিখতে সাহস করেননি। এলাকাবাসী জানেন, কে রাজাকার ছিলেন, কিন্তু বলতে ভয় পান। কারণ, এতদিনে তারা আর্থিক-সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছেন।
সাক্ষী সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে বেগ পেতে হয়েছিল, সেটা সামাল দিলেন কিভাবে?
ভয়ানক সমস্যা ছিল। সাক্ষীরদের সাক্ষ্য দেওয়ার ব্যাপারে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। তেমন সাক্ষীদের ভেতর কেউ-কেউ আসামিপক্ষের প্রলোভনের শিকার হয়েছেন। শুরুর দিকে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ক্ষেত্রে খুব ভয়ঙ্করভাবে এসবের মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাদের। কিন্তু সাক্ষীরা অনেক ক্ষেত্রে প্রলোভনে পা দিয়েছেন। তার অন্যতম উদাহরণ সাঈদীর মামলায় সাক্ষী বিষাবালী। যিনি আমাদের সাক্ষী হওয়ার পরও আসামিপক্ষের সাক্ষী তালিকায় না থাকার পরও আসামিপক্ষের দ্বারা অপহরণের নাটকের অংশ হয়েছেন।
যে সব পরিবার মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার, তারা মনে করেন, আমি যদি সাক্ষ্য দেই, সরকার পরিবর্তনের পর আমাকে কে নিরাপত্তা দেবে। তাদের এই ভয় সবক্ষেত্রে আমরা দূর করতে পারিনি।
কিন্তু আমরা এতদিন ধরে শুনছি, সাক্ষী সুরক্ষা আইনের কথা। বিশেষত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষীদের বিবেচনায় নিয়ে এটা দ্রুত হওয়া দরকার ছিল। এতদিনেও সম্ভব হচ্ছে না কেন?
এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে। বিদেশে যেটা হয়, তাদের উইটনেস প্রটেকশন সেকশন আলাদা আছে। বড় দেশ, বিত্তবান দেশ সাক্ষীদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়, নাম চেঞ্জ করে, প্লাস্টিক সার্জারি করে তার নতুন জীবনের ব্যবস্থা করে দেয়। সেটা আমাদের দেশে করা সম্ভব নয়। তবু, নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মিলে যদি একটা কোনও ব্যবস্থা করতে পারেন, সেটা জরুরি। কারণ এখনই আমাদের প্রায় পাঁচশ সাক্ষী আছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে সাক্ষীর জন্য বড় ঝুঁকি। যে নারীরা ভিকটিম, তাদের আমরা আনতেই ব্যর্থ হয়েছি। অনেকক্ষেত্রে কেবল সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি বলে।
তারপরও আমরা ভিকটিম নারীদের ক্যামেরা ট্রায়াল হতে দেখেছি। এই সাক্ষীদের আনা সম্ভব হলো কী করে?
অনেক সময় হয়েছে কি, আমরা ভিকটিম নারীর সাক্ষ্য নিতে যাব, তা শুনে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছেন। আবার অনেকসময় ভিকটিম রাজি হলেও তার পরিবারের সদস্যরা রাজী হয়নি। ভিকটিম হয়তো দেশেই আছে, ভাই বলে দিয়েছে ভিকটিম দেশের বাইরে, মেয়ে নিষেধ করেছে মাকে মুখ খুলতে। এমন অনেক সমস্যার পরও ইতোমধ্যে আমরা বেশকিছু সাক্ষীকে হাজির করতে পেরেছি।
সাঈদির মামলায় নথিতে কোনও সমস্যা ছিল বলে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে আপনার মনে হয়? আপিলে গিয়ে মৃত্যুদণ্ড কমে আমৃত্যু কারাদণ্ড হলো কী করে? আপনাদের ব্যর্থতা কতটুকু?
সাঈদির মামলায় বিচারিক আদালতে আমরা মৃত্যুদণ্ড পেয়েছি। এখন পরবর্তী সময়ে আপিলে গিয়ে কেন হলো না সেটা নিয়ে এখনও কথা বলা যাবে না কারণ, মামলাটি রিভিউয়ের শুনানির অপেক্ষায় আছে। যে কাগজ বিচারিক আদালতে দিয়েছিলাম তার ওপর ভিত্তি করেই কিন্তু মৃত্যুদণ্ড পাওয়া গেছে। আমাদের বিষয়ে বা প্রসিকিউশনের বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ আছে, সেটা নিয়ে এখনই কিছু বলতে চাই না।
আমাদের তদন্ত দল ব্যর্থ বলা যাবে না। কারণ, এখন পর্যন্ত বিচারিক আদালতে সবকয়টি মামলা প্রমণিত হয়েছে এবং একটাও খালাস হয়নি। আমরা যে কয়টা মামলা তৈরি করে দিয়েছি সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়া গেছে। মামলার যে পরিসংখ্যান সে অনুযায়ী আমি আমার দলকে নিয়ে কোনও সমালোচনা করতে চাই না।
/এমএনএইচ/








